জাতীয় ডেস্ক
মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে জনগণের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পুলিশ সদস্যদের প্রতিটি পদক্ষেপে রাষ্ট্রীয় সেবকের প্রতিফলন থাকতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘন বরদাশত করা হবে না।
সোমবার (১১ মে, ২০২৬) পুলিশ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ‘পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমান বাস্তবতায় পুলিশিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যে পুলিশ বাহিনীর অপারেশনাল কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে মানবাধিকারের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অপরাধ দমন বা তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশকে আরও কৌশলী হতে হবে। বিশেষ করে জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী ন্যূনতম বলপ্রয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রসিকিউশন টিমকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে মানবাধিকারের প্রতিটি দিক কঠোরভাবে অনুসরণ করার জন্য তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
পুলিশের সেবার মান নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী বলেন, থানায় আসা কোনো সেবা প্রার্থী যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা পুলিশের পবিত্র দায়িত্ব। পুলিশের সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’—এই স্লোগানটি কেবল প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে আধুনিক পুলিশিংয়ের মূল লক্ষ্য।
বাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখার বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকার পুলিশ বাহিনীতে যেকোনো ধরনের দুর্নীতি বা অপেশাদার আচরণকে প্রশ্রয় দেবে না। চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলা ভঙ্গকারী যেকোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে মন্ত্রী একটি গুরুত্বপূর্ণ রোডম্যাপ তুলে ধরেন। তিনি জানান, পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রম এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ‘বডিওর্ন ক্যামেরা’র ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো হবে। ভবিষ্যতে তদন্ত এবং মাঠ পর্যায়ের প্রতিটি অভিযান রেকর্ডে রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে, যাতে করে যেকোনো অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
এছাড়া দেশের পর্যটন শিল্পের প্রসারে টুরিস্ট পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টিও মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাস্তবতায় পুলিশিং এখন কেবল গতানুগতিক অপরাধ দমনে সীমাবদ্ধ নেই। সাইবার অপরাধ থেকে শুরু করে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে পুলিশকে দক্ষ হতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দিকনির্দেশনা বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীকে একটি জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব সংস্থায় রূপান্তর করতে সহায়ক হবে। বিশেষ করে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মানবাধিকারের ওপর গুরুত্বারোপ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে।
অনুষ্ঠানে পুলিশের মহাপরিদর্শকসহ (আইজিপি) সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর পুলিশ বাহিনীর সংস্কার ও আধুনিকায়নের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি মানবিক পুলিশ বাহিনী গঠনই এখন সময়ের প্রধান দাবি।


