আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান তিন মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তি চূড়ান্তকরণের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। আজ সোমবারই (২৫ মে) এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রধান মিত্র ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি ওয়াশিংটনের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি।
চার দিনের সরকারি সফরে ভারতে অবস্থানরত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সোমবার দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সম্পাদনে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে জোরালো আলোচনা চলছে। গত রাতেই এই চুক্তি সংক্রান্ত চূড়ান্ত ঘোষণা আসার কথা ছিল, যা আজ যেকোনো সময় প্রকাশ্যে আসতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এ নিয়ে অতিরিক্ত তাড়াহুড়া বা অতি-উৎসাহ প্রকাশের প্রয়োজন নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এলো যার মাত্র একদিন আগে, অর্থাৎ রোববার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য এই চুক্তির বিষয়ে কিছুটা সতর্ক অবস্থান নেন। ট্রাম্প তাঁর আলোচক দলকে কোনো ধরনের তড়িঘড়ি না করে একটি কার্যকর চুক্তি প্রণয়নের নির্দেশ দেন। প্রেসিডেন্টের এই অনমনীয় অবস্থানের প্রতিধ্বনি তুলে রুবিও বলেন, মার্কিন প্রশাসন কোনো অবস্থাতেই একটি দুর্বল বা ‘খারাপ সমঝোতা’ মেনে নেবে না। চুক্তিটি বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির স্বার্থেই সুদূরপ্রসারী এবং অর্থবহ হতে হবে।
প্রস্তাবিত এই চুক্তির মূল বিষয়বস্তুর ওপর আলোকপাত করে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং অবরুদ্ধ কৌশলগত জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক দেশগুলোর ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো একমত হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা কেবল যৌক্তিকই নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। এছাড়া, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক এবং ফলপ্রসূ আলোচনায় ইরান অংশ নেবে বলেও ওয়াশিংটন প্রত্যাশা করছে।
ভূ-রাজনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেও ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন রুবিও। তিনি বলেন, চলমান শান্তি প্রক্রিয়া বা যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরাইলের আত্মরক্ষার সর্বজনীন অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে। লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যদি ইসরাইলের ওপর নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় বা হামলার প্রস্তুতি নেয়, তবে ইসরাইল নিজের সুরক্ষায় পাল্টা জবাব বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখে। এই নীতিটি আন্তর্জাতিকভাবে সর্বদা স্বীকৃত এবং বর্তমান যুদ্ধবিরতির সময়েও এটি কার্যকর রয়েছে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে বিমান হামলা চালালে এই যুদ্ধ শুরু হয়। এর জবাবে ইরানও পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরাইলকে লক্ষ্য করে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে এবং গত ৮ এপ্রিল থেকে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে।
বর্তমানে এই যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী ৬০ দিনের শান্তি চুক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা চলছে, যার আওতায় ইরানকে নির্দিষ্ট শর্তে তেল বিক্রি এবং অবরুদ্ধ বৈদেশিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। নয়াদিল্লিতে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উত্তর ভারতের ঐতিহাসিক পর্যটন নগরী আগ্রার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। কূটনৈতিক মহলের ধারণা, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই এশিয়া সফরের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এই চুক্তিটি চূড়ান্ত রূপ পেতে পারে।


