অপরাধ ডেস্ক
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার মমিনহাটা গ্রামে চাঞ্চল্যকর রিতা মজুমদার (৫০) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। জমি বিক্রির টাকা লুটের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত দুই আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আসামিদের রক্তমাখা পোশাক এবং তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিলের কচুরিপানা থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি হাসুয়া উদ্ধার করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আজ সকালে বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন গাবতলী উপজেলার মমিনহাটা (পূর্বপাড়া) গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেন (৩৫) এবং একই গ্রামের মো. শাওন মিয়া (২০)। তারা দুজনই এলাকায় দিনমজুর হিসেবে একসঙ্গে কৃষিকাজ করতেন বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
পুলিশ জানায়, গত ২০ মে দিবাগত রাতে মমিনহাটা গ্রামে ভিকটিম রিতা মজুমদার ও তার স্বামী বিধান মজুমদার রাতের খাবার খেয়ে আলাদা ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে ঘরের ভেতর অস্বাভাবিক শব্দ শুনে বিধান মজুমদার লাঠি হাতে স্ত্রীর ঘরের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় ঘরের দরজা খোলা এবং আলো নেভানো দেখে তিনি ঘরের বাতি জ্বালান। বাতি জ্বালাতেই মেঝের ওপর স্ত্রী রিতা মজুমদারের রক্তাক্ত গলাকাটা মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে আসার আগেই ঘাতকরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
প্রাথমিক অবস্থায় এই হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বা সূত্র ছিল না। জেলা পুলিশের সার্বিক নির্দেশনায় গাবতলী থানা পুলিশ তথ্য-প্রযুক্তি এবং গোপন অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার তদন্ত শুরু করে। তদন্তের ধারাবাহিকতায় গতকাল রাতে মমিনহাটা গ্রাম থেকে প্রথমে শাওন মিয়াকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে শাওন হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন এবং তার সহযোগী আনোয়ার হোসেনের নাম প্রকাশ করেন। শাওনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে আনোয়ারকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে আনোয়ার জানতে পারেন যে রিতা মজুমদারের বাড়িতে জমি বিক্রির মোটা অঙ্কের টাকা রাখা আছে। সেই টাকা লুটের পরিকল্পনা করে আনোয়ার স্থানীয় সুখানপুকুর সৈয়দ আহম্মদ কলেজ বাজার থেকে ৬০০ টাকা দিয়ে দুটি নতুন হাসুয়া কিনে নিজেদের হেফাজতে রাখেন। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২০ মে রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভিকটিম ও তার স্বামী বাড়ির বাইরে রাখা ধান ও খড় গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগে আসামিরা মূল ফটক দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে এবং গোয়ালঘরে লুকিয়ে থাকে।
রাত সোয়া ১২টার দিকে শাওন রিতা মজুমদারের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিলে তিনি টর্চলাইট নিয়ে বাইরে বের হন। এ সময় রিতা মজুমদার আসামি আনোয়ারকে চিনে ফেললে ধরা পড়ার আতঙ্কে আনোয়ার তার হাতে থাকা হাসুয়া দিয়ে ভিকটিমের গলায় আঘাত করেন। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এরপর ভিকটিমের গোঙানি এবং তার স্বামীর চিৎকার শুনে আসামিরা কোনো টাকা লুট করতে না পেরেই প্রধান ফটক দিয়ে পালিয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা তাদের রক্তমাখা হাসুয়া দুটি একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে প্রথমে ঘাসের জমিতে এবং পরবর্তীতে বয়ারবাড়ী বিলের কচুরিপানার মধ্যে লুকিয়ে রাখে। অভিযানকালে পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাসুয়া দুটি ছাড়াও ঘটনার সময় আসামি আনোয়ারের পরিহিত রক্তমাখা প্যান্ট, গেঞ্জি, মোবাইল ফোন এবং অপর আসামি শাওনের পরিহিত কালো রঙের পোশাক জব্দ করেছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে গাবতলী থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।


