সারাদেশ ডেস্ক
গত কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে রাঙামাটি জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। জেলার বাঘাইছড়ি, লংগদু ও বিলাইছড়িসহ বেশ কয়েকটি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের তোড়ে সড়ক তলিয়ে যাওয়া এবং ভূমিধসের কারণে বাঘাইছড়ি, লংগদু ও দীঘিনালার মধ্যে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে রাঙামাটি সদর উপজেলায় পাহাড় ধস ও পাহাড়ি ঢলে ভেসে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বিলাইছড়ি উপজেলায় আরও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা শুরু করা হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বাঘাইছড়ি-দীঘিনালা এবং লংগদু-দীঘিনালা সড়কের বিভিন্ন অংশ সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী ইউনিয়নের করেঙ্গাতলী ও পৌর এলাকার উগলছড়ি সড়ক জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া, বাঘাইছড়ি-মারিশ্যা-দীঘিনালা সড়কের প্রায় ৩ কিলোমিটার অংশে পাহাড় ধসের কারণে রাস্তা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ওই রুটে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে, যা দুর্গত এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মারাত্মক সংকটে ফেলেছে।
দুর্যোগের কারণে জেলায় এ পর্যন্ত একজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। রাঙামাটি সদর উপজেলার মগবান ইউনিয়নে পাহাড় ধস ও টানা বর্ষণের মধ্যে নদী পার হতে গিয়ে তলিয়ে যান দলমনি চাকমা নামে এক ব্যক্তি। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে, বিলাইছড়ি উপজেলায় বহিরাগত এক ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে, তাকে উদ্ধারে তৎপরতা চালাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জানিয়েছেন, বন্যা ও পাহাড় ধসের চরম ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আজ শুক্রবার সকাল পর্যন্ত জেলার ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ৫২৪ জন মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় গতকাল বৃহস্পতিবার থেকেই জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাহাড় ধসের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ঢালু ও পাদদেশের বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং ও বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে সতর্কবার্তা জারি রাখা হয়েছে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সাজেক ভ্যালিতে আটকেপড়া পর্যটকদের উদ্ধারে যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জেলা প্রশাসক জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার দেড় শতাধিক পর্যটককে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার পর, আজ শুক্রবার সকালে সাজেকে আটকে থাকা আরও ৪২১ জন পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বিশেষ সহায়তায় খাগড়াছড়িতে নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে সাজেক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো পর্যটক সেখানে আটকা নেই।
দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারিভাবে জরুরি ত্রাণ সহায়তা বরাদ্দ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে উপদ্রুত এলাকার মানুষের জন্য বিশেষ খাদ্যশস্য এবং নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই বরাদ্দকৃত চাল ও অর্থ জেলা সদরসহ ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি উপজেলায় চাহিদা অনুযায়ী বন্টন করার কাজ শুরু হয়েছে।
এদিকে, স্থানীয় সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান রাঙামাটি শহর এবং কাপ্তাই উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। তিনি আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থানরত দুর্গত মানুষদের খোঁজখবর নেন এবং তাদের মাঝে শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করেন। এই সংকটকালীন সময়ে রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে সব স্তরের নেতাকর্মী ও সামাজিক সংগঠনকে দুর্গত এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আবহাওয়ার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। বন্যা ও পাহাড় ধস পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে উদ্ধার অভিযান জোরদার করার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।


