জাতীয় ডেস্ক
গণঅভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার দায়িত্ব পালনের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ করেছে। এ সময়ে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য এবং বিচার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতে দৃশ্যমান সংস্কার ও জনমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হয়েছে। গতকাল বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁও কার্যালয়ের ‘করবী’ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এই ১০০ দিনের অগ্রগতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র জানান, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১০০ দিনে মন্ত্রিসভার ১০টি বৈঠকে গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মধ্যে ইতোমধ্যে ৩৭টি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকি ২৩টি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকেই ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এছাড়া ‘কৃষক কার্ড’ চালুর মাধ্যমে কৃষি খাতকে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। দেশের পানি ও সেচ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য কৌশলগত পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে মুখপাত্র জানান, নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে। ধর্মীয় ক্ষেত্রে অবদান বিবেচনায় ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের জন্য সরকারি সম্মানি প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া সাধারণ গ্রাহকদের স্বস্তি দিতে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও লুণ্ঠিত রাষ্ট্রীয় মালিকানা পুনরুদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আওতাত এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রবাসী আয়ে গতিশীলতা আসায় গত মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জিত হয়েছে। প্রবাসীদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে ‘প্রবাসী কার্ড’ এবং ফ্রিল্যান্সিং খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২ লাখ ফ্রিল্যান্সারকে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র প্রদানের কাজ চলছে। বন্ধ কলকারখানা চালু ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ইকোনমিক করিডোর বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। জনসাধারণের জন্য বিমানবন্দর ও ট্রেনে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা এবং যুব সমাজের জন্য বিশেষ ক্রীড়া কর্মসূচি চালুর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহা কেন্দ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ও নাগরিক সেবা নিশ্চিতে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ, রেলে নারীদের জন্য আলাদা কম্পার্টমেন্টসহ বিশেষ ট্রেন ও নৌ-সার্ভিস এবং ৮ ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
আইন ও বিচার বিভাগের সংস্কার প্রসঙ্গে মুখপাত্র মেহেরপুরে শিশু ধর্ষণের মামলায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রদানের নজির এবং চাঞ্চল্যকর শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার নিশ্চিতে চার্জশিট দাখিলের বিষয়টি উল্লেখ করেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নীতিমালার অংশ হিসেবে বাংলাদেশি পাসপোর্টে পুনরায় ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধ যুক্ত করার আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মুখপাত্র উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার সংবাদমাধ্যমের সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রেখে অপপ্রচার ও বিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড পরিহার করা জরুরি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান এবং ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনিসহ প্রেস উইংয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


