ঐতিহাসিক জরাজীর্ণতায় চট্টগ্রামের ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’, সুরক্ষায় তিন ধাপের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

ঐতিহাসিক জরাজীর্ণতায় চট্টগ্রামের ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’, সুরক্ষায় তিন ধাপের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

জাতীয় ডেস্ক

জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক ও স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন চট্টগ্রামের ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ বর্তমানে চরম অবহেলা ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। শতবর্ষী এই ঐতিহাসিক ভবনের দেয়াল ও ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার পাশাপাশি ভেতরে সংরক্ষিত মহান মুক্তিযুদ্ধ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অমূল্য স্মৃতিচিহ্নগুলো নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এর মূল কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে তিন ধাপের একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি এলাকায় ৩ দশমিক ১৭ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে নির্মিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্যাগোডা ধাঁচের স্থাপত্যশৈলী এবং স্থানীয় বহুস্তরবিশিষ্ট টিনশেড নকশার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ এই ভবনটি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ভবনটিতে ক্যাম্প স্থাপন করে নির্যাতনকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল। স্বাধীনতার পর এটি সার্কিট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এই ভবনেই একদল সেনা সদস্যের হাতে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৯৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এটিকে ‘জিয়া স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।

বর্তমানে জাদুঘরটিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের মাইক্রোফোন ও টেবিলের প্রতিরূপ, সাত বীরশ্রেষ্ঠ ও সেক্টর কমান্ডারদের ছবি, জেড ফোর্সের লেটারপ্যাড এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত রাইফেলসহ মোট ৮৭৬টি ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি এখানে রয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতির সাধারণ জীবনযাপনের স্মারক, তাঁর হাতে লেখা রাজনৈতিক নোট এবং ১৯ দফা কর্মসূচির দলিল।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জাদুঘরের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলার দেয়াল এবং ছাদ ধসে পড়ছে। কাঠের সিঁড়ি ও জানালাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ১৯৭১ সালের মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার সাক্ষী কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি, রক্তমাখা ম্যাট, মরদেহ বহনের স্ট্রেচার এবং বিভিন্ন ধাতব পদকসহ বহু নিদর্শনে মরিচা ধরেছে ও বিবর্ণ হয়ে গেছে। বিগত বছরের ২ ডিসেম্বর এক ভূমিকম্পের প্রভাবে দ্বিতীয় তলার সিঁড়ি সংলগ্ন দেয়ালের একটি অংশ ধসে পড়লে নিরাপত্তাজনিত কারণে দর্শনার্থীদের প্রবেশ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত সরকারের সময়ে যথাযথ রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবেই স্থাপনাটি এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় পৌঁছেছে।

এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই স্মৃতি সুরক্ষায় জাদুঘরটিকে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বা ‘হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তিন ধাপের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর প্রথম ধাপে এটিকে হেরিটেজ সাইট ঘোষণা, দ্বিতীয় ধাপে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে পূর্ণাঙ্গ সংস্কার এবং তৃতীয় ধাপে আংশিকভাবে দর্শনার্থীদের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

জাদুঘর প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ বরাদ্দের আওতায় ১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ কাজ গত ২ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে, যা আগামী জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ভবনের দেয়াল স্ক্র্যাপিং, রঙ করা, সীমানা প্রাচীর ও মূল কাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ, বাগানের আলোকসজ্জা এবং বিশ্রামাগার সংস্কারের কাজ চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শতবর্ষী এই ভবনটি দেশের ইতিহাস ও জনগণের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। চলমান সংস্কার ও মেরামত কাজ শেষ হওয়ার পর দর্শনার্থীদের আগ্রহ ও কৌতূহল বিবেচনায় বর্তমানে বন্ধ থাকা জাদুঘরের একটি অংশ আবারও খুলে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ