আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলায় একটি গণতান্ত্রিক অন্তর্বর্তীকালীন উত্তরণের লক্ষ্যে নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের জোরালো দাবি জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ বিরোধীদলীয় নেতারা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নিজেকে প্রকৃত বিজয়ী দাবি করা সাবেক কূটনীতিক এডমান্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়া এবং প্রধান বিরোধী নেতা মারিয়া করিনা মাচাদো যৌথভাবে এই নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানান। তবে গত জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক অভিযানে সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ওয়াশিংটন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচন আয়োজনের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
বর্তমানে স্পেনে নির্বাসিত ৭৬ বছর বয়সী গঞ্জালেজ উরুতিয়া এক ভিডিও বার্তায় জানান, ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতা ও প্রকৃত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে পানামায় দেশটির প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো একত্রিত হয়েছে। জনগণের দেওয়া ম্যান্ডেটকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী প্রধান বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গঞ্জালেজের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। মাচাদো জানান, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সরকারের সঙ্গে একটি নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিয়ে আলোচনা করতে তারা প্রস্তুত এবং এই প্রক্রিয়া সফল করতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা ও সহায়তা কামনা করেছেন।
২০২৪ সালের ২৮ জুলাই অনুষ্ঠিত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাচাদোকে আইনিভাবে অযোগ্য ঘোষণা করা হলে শেষ মুহূর্তে গঞ্জালেজ উরুতিয়াকে বিরোধী জোটের প্রার্থী করা হয়েছিল। ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন নিকোলাস মাদুরোকে দেশটির নির্বাচনী কাউন্সিল বিজয়ী ঘোষণা করলেও ভোটের বিস্তারিত ফলাফল প্রকাশ করা হয়নি। বিরোধী দল এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গঞ্জালেজ উরুতিয়া ২-১ ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক রাষ্ট্র তাকেই বৈধ বিজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরবর্তী সময়ে মাদুরো সরকারের রাজনৈতিক নিপীড়ন ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে গঞ্জালেজ স্পেনে এবং মাচাদো দেশত্যাগে বাধ্য হন।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনী কারাকাসে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করে মাদক পাচারের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করতে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। মাদুরোর পতনের পর ৫ জানুয়ারি তাঁর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের স্থায়ী অনুপস্থিতিতে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও রদ্রিগেজ প্রশাসন সেই সময়সীমা অতিক্রম করেছে। বিরোধী দল এই সরকারকে মাদুরোর দমনমূলক ব্যবস্থারই অংশ হিসেবে বিবেচনা করলেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বর্তমান মার্কিন প্রশাসন রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলার একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রদ্রিগেজ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ (PDVSA)-এর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বিলোপ করে জ্বালানি খাতকে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করেছে। বিশ্ববাজারে তেলের ঊর্ধ্বগতির কারণে মার্কিন প্রশাসন রদ্রিগেজ সরকারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে এবং মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন এই মুহূর্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও খনিজ তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে রদ্রিগেজ সরকারের ওপর সন্তুষ্ট, যা ভেনেজুয়েলায় দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাচাদো ও গঞ্জালেজের এই নতুন ঘোষণা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং হোয়াইট হাউসের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


