অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বিশ্ব পুঁজিবাজারে আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরুর আগেই নিজেদের বাজার মূল্যায়নে (মার্কেট ভ্যালুয়েশন) নতুন রেকর্ড গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স (SpaceX)। আগামী সপ্তাহে মার্কিন শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের সম্ভাব্য বাজার মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন (পৌনে দুই লাখ কোটি) মার্কিন ডলার।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও (IPO) সংক্রান্ত বিস্তারিত পরিকল্পনা উল্লেখ করে মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (SEC)-এর কাছে জমা দেওয়া সংশোধিত বিবরণী (প্রোসপেক্টাস) থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
নথির তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্স তাদের প্রতিটি শেয়ারের প্রারম্ভিক মূল্য ১৩৫ ডলার প্রস্তাব করেছে। এই মূল্যের ওপর ভিত্তি করেই কোম্পানিটির সামগ্রিক বাজার মূল্য প্রাক্কলন করা হয়েছে ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার। সাধারণত পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার ঠিক আগের দিন কোম্পানিগুলো তাদের শেয়ারের চূড়ান্ত বা আনুমানিক বিক্রয়মূল্য প্রকাশ করে থাকে। তবে স্পেসএক্স তাদের আইপিও অভিষেকের এক সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে এই মূল্য ঘোষণা করেছে, যা আন্তর্জাতিক শেয়ার বাজারের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএআই’ (xAI)-এর সঙ্গে একীভূত হওয়ার পর স্পেসএক্সের বাজার মূল্য প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির মূল্যবৃদ্ধির এই প্রবণতাকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা। তবে এই প্রাথমিক দরই চূড়ান্ত নয়; বিশ্ব বাজারে ক্রেতাদের প্রকৃত চাহিদা ও উন্মুক্ত বাজারের ওঠানামার ওপরই নির্ভর করবে শেয়ারের চূড়ান্ত লেনদেন মূল্য।
ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১২ জুন (শুক্রবার) মার্কিন প্রযুক্তিভিত্তিক শেয়ার বাজার ‘নাসদাক’ (Nasdaq)-এ ‘SPCX’ টিকারে স্পেসএক্সের আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই আইপিও’র মাধ্যমে বাজার থেকে রেকর্ড ৭৫ বিলিয়ন ডলার মূলধন বা তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কোম্পানিটি, যা বিশ্ব পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ আইপিও হতে যাচ্ছে। এর আগে ২০১৯ সালে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো সর্বোচ্চ ২৬ বিলিয়ন ডলার তহবিল সংগ্রহ করে রেকর্ড গড়েছিল।
রকেট তৈরি ও মহাকাশ অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি স্পেসএক্সের অধীনে রয়েছে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিংক’ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের ব্যবসা। যদি তাদের শেয়ার প্রত্যাশিত ১৩৫ ডলার বা তার বেশি মূল্যে বিক্রি শুরু হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি জায়ান্টদের তালিকায় অন্যতম মূল্যবান কোম্পানি হিসেবে নাম লেখাবে স্পেসএক্স। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের তালিকায় কেবল অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও এনভিডিয়ার মতো অল্প কয়েকটি মার্কিন প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
স্পেসএক্সে ৮০ শতাংশের বেশি ভোটিং ক্ষমতার অধিকারী প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক এই আইপিও’র সফল সমাপ্তির হাত ধরে বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নেয়ার’ বা লাখো কোটি পতির মর্যাদার কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারেন। ফোর্বসের তথ্যমতে, বর্তমানে মাস্কের মোট সম্পদের একটি বড় অংশই এই স্পেসএক্সের অংশীদারিত্বের ওপর নির্ভরশীল।
তবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারের অতীত পরিসংখ্যান সব সময় শতভাগ ইতিবাচক থাকে না। বৈশ্বিক পুঁজিবাজার গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দশকে পাবলিক মার্কেটে তালিকাভুক্ত হওয়া বড় কোম্পানিগুলোর প্রায় অর্ধেকই তাদের অভিষেকের সময়ের চেয়ে পরবর্তী সময়ে বাজার মূল্য হারিয়েছে। তা ছাড়া, প্রোসপেক্টাস অনুযায়ী স্পেসএক্স বৈশ্বিক মহাকাশ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বড় বিনিয়োগের কারণে সাম্প্রতিক প্রান্তিকগুলোতে পরিচালন লোকসানের সম্মুখীন হয়েছে। ফলে এই মেগা আইপিও ঘিরে একদিকে যেমন বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতাও বিরাজ করছে।


