আন্তর্জাতিক ডেস্ক
লন্ডন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে সংঘটিত হেনরি নওয়াক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু মন্তব্যকে ব্রিটিশ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ডাউনিং স্ট্রিট সরাসরি কারও নাম উল্লেখ না করলেও, এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের নেপথ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য রয়েছে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে।
ঘটনার সূত্রপাত মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে। তিনি দাবি করেন, ইউরোপের রাজনৈতিক অভিজাতদের ‘স্ব-বিদ্বেষের রাজনীতি’ এবং ‘বিপুল অভিবাসন নীতি’র কারণেই এই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক অভিবাসী পশ্চিমা সমাজ ও নাগরিকদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করে। মার্কিন প্রশাসনের এমন মন্তব্যের পর ডাউনিং স্ট্রিটের মুখপাত্র তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে জানান, কিছু ব্যক্তি যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছেন এবং রাস্তায় বিভাজন উসকে দিচ্ছেন। নওয়াক পরিবার যেখানে এই মৃত্যুকে ঘিরে কোনো বিভাজন বা উত্তেজনা না ছড়ানোর অনুরোধ করেছে, সেখানে বহিরাগত এই রাজনৈতিক বক্তব্য ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে হেনরি নওয়াক নামের এক ব্রিটিশ নাগরিককে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা। ঘটনার সময় মারাত্মকভাবে আহত অবস্থায় পুলিশ তাকে হাতকড়া পরায়, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়। হামলাকারী ভিকরাম ডিগওয়া আদালতে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং তাকে ন্যূনতম ২১ বছরের কারাদণ্ডসহ যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছে। তবে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হলেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বিষয়টি এখন স্বাধীন পুলিশ আচরণ পর্যবেক্ষণ সংস্থার (আইওপিসি) তদন্তাধীন রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের এই অভ্যন্তরীণ ফৌজদারি বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, বিশেষ করে মার্কিন রাজনীতিতে নানামুখী ব্যাখ্যা দেওয়া শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর এক বিবৃতিতে ঘটনাটিকে ‘পশ্চিমা সভ্যতার অবক্ষয়’ এবং ‘দুই-স্তরের পুলিশিং’-এর উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেন যে, পুলিশকে সম্পূর্ণ পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করতে হবে এবং বাইরে থেকে কে কী বলছে তা বিবেচ্য নয়। তবে তিনি এও স্বীকার করেন যে পুলিশের কার্যক্রম নিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যুতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। লিবারেল ডেমোক্র্যাট পার্টির নেতা এড ডেভি মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে ব্রিটিশ গণতন্ত্রে আক্রমণ চালাচ্ছে। অন্যদিকে, এক্সের মালিক ইলন মাস্ক এবং রিফর্ম ইউকে নেতা নাইজেল ফারাজের মতো ডানপন্থী ব্যক্তিত্বরা ঘটনাটিকে শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করায় বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে। অবশ্য যুক্তরাজ্যের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি ‘দুই-স্তরের বিচারব্যবস্থা’র এই দাবিকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী নওয়াকের পরিবারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং হ্যাম্পশায়ার পুলিশের ভূমিকা পর্যালোচনার আশ্বাস দিয়েছেন। ডাউনিং স্ট্রিট দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ বলে দাবি করলেও, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিবাসন নীতি, বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং ট্রান্স-আটলান্টিক কূটনৈতিক সম্পর্কে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


