অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জনের কৌশল হিসেবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ১০টি বিশেষ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে একটি নতুন ও শক্তিশালী উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তব্য উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সরকারের এই মহাপরিকল্পনার কথা জানান। তিনি উল্লেখ করেন, সরকারের পরিকল্পিত নীতি ও কৌশলগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মর্যাদাপূর্ণ ক্লাবে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। এর ফলে দেশের জনমিতিক লভ্যাংশ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড), গড় আয়ু বৃদ্ধিজনিত সুবিধা এবং গণতান্ত্রিক লভ্যাংশ অর্জনের এক অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি হবে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশে উন্নীত করার সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
টেকসই অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়নে ১০ অগ্রাধিকার
অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে সরকার যে ১০টি প্রধান খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
-
সবার জন্য উন্নয়ন: দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সর্বস্তরের মানুষ, সব খাত এবং সব অঞ্চলের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজ থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা।
-
মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা: তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে বাস্তবমুখী, দক্ষতানির্ভর ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের নাগরিকের জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
-
সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা: একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি শক্তিশালী করতে সব বয়স ও শ্রেণির মানুষের জন্য জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বলয় সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
-
বিনিয়োগনির্ভর ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি: পরিকল্পিত শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিকে একটি কৌশলগত খাত হিসেবে আরও শক্তিশালী করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
-
সহজিকৃত ব্যবসার পরিবেশ (ইজ অব ডুইং বিজনেস): দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকারি কার্যক্রমে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা ও বিলম্ব কমিয়ে একটি স্বচ্ছ, সহজ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
-
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: ব্যাংক ও অসংগঠিত আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারে প্রয়োজনীয় সংস্কার এনে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ থাকবে।
-
জ্বালানি নিরাপত্তা: দেশের উৎপাদনশীল খাতগুলোকে সচল রাখতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
-
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ: প্রযুক্তিগতভাবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) পণ্য ও সেবা রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
-
পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক অভিঘাত মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও বনায়ন সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া দেশের নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধার এবং দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় চালুর মাধ্যমে পরিবেশ-সহনশীল ভবিষ্যৎ গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
-
জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা: মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি খাতের বিনিয়োগ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও সম্ভাবনা
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের এই ১০টি অগ্রাধিকার খাতের সফল এবং সময়োপযোগী বাস্তবায়ন অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের ওপর দেশের সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে। সরকার মনে করছে, এই অগ্রাধিকারসমূহ সুচারুভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা ২০৩৪ সালের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথকে সুগম করবে।


