পোশাক খাতের আধুনিকায়ন ও টেকসই উন্নয়নে বিজিএমইএ-ওকাইব যৌথ উদ্যোগ

পোশাক খাতের আধুনিকায়ন ও টেকসই উন্নয়নে বিজিএমইএ-ওকাইব যৌথ উদ্যোগ

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং টেকসই শিল্পায়নের সুযোগ সম্প্রসারণে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন ইন বাংলাদেশ (ওকাইব)-এর মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উভয় সংগঠনের শীর্ষ নেতারা বাংলাদেশের পোশাক খাতের বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির রোডম্যাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

বিজিএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি ইনামুল হক খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সভায় সংগঠনের সহসভাপতি মো. রেজোয়ান সেলিম, ভিদিয়া অমৃত খান, মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরীসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, ওকাইবের প্রেসিডেন্ট ফেলিক্স চ্যাং ওয়াই সি-এর নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নেয়। সভায় মূলত বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়।

বৈঠকে তৈরি পোশাক খাতে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির বহুমাত্রিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে দেশের রুগ্ণ ও বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক কারখানাগুলো অধিগ্রহণ, যৌথ মালিকানায় (জয়েন্ট ভেঞ্চার) ব্যবসা পরিচালনা এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বা সংযোগ শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি মূলধন ও উন্নত প্রযুক্তির সাথে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটলে বাংলাদেশের পোশাক খাতের উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

তবে বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কিছু প্রশাসনিক ও নীতিগত জটিলতার বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। ওকাইবের প্রতিনিধিরা জানান, কাস্টমস ও বন্ড সংক্রান্ত জটিলতা, যন্ত্রপাতি আমদানি এবং বন্দর থেকে পণ্য খালাস প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা নতুন বিনিয়োগের গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। এই প্রতিবন্ধকতা দূর করতে বাংলাদেশে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু এবং শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ সহজ ও দ্রুত করার আহ্বান জানান চীনা উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে সোয়েটার শিল্পের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে পুরনো জ্যাকর্ড মেশিন প্রত্যাহার করে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মেশিন সরবরাহের জন্য একটি বিশেষ ‘বিনিময় নীতি’ চালুর প্রস্তাব দেয় ওকাইব। কিন্তু বর্তমান কাস্টমস ও প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা দূরূহ হয়ে পড়েছে বলে তারা উল্লেখ করেন।

জবাবে বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দ আশ্বস্ত করেন যে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাস্টমস ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উচ্চপদস্থ সংস্থাগুলোর সাথে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা করবেন। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অনেকেই চীনা অংশীদারিত্বে ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহী উল্লেখ করে বিজিএমইএ নেতারা দুই দেশের ব্যবসায়ীদের সুবিধার্থে একটি কার্যকর ও সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম তৈরির ঘোষণা দেন।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ওপর সভায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পোশাক কারখানার আধুনিকায়নের পাশাপাশি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হন উভয় পক্ষ। ওকাইবের প্রতিনিধিদল সার্কুলার ফ্যাশন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং বাংলাদেশে কার্বন ট্রেডিং খাতের উন্নয়নে তাদের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করার আগ্রহ প্রকাশ করে।

বিজিএমইএ নেতারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বর্তমানে সাধারণ পোশাক তৈরি থেকে সরে এসে উচ্চমূল্য সংযোজিত (হাই-ভ্যালু অ্যাডেড) এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই পোশাক উৎপাদনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় চীনের উন্নত কারিগরি অভিজ্ঞতা ও শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ সক্ষমতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে। ওকাইবের সভাপতি ফেলিক্স চ্যাং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কাঠামোগত রূপান্তরের প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও কারিগরি সহযোগিতা আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ