আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে আলোচনায় লুকা জিদান: কালো মাস্কের নেপথ্যে যে চোট ও ফিরে আসার লড়াই

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচে আলোচনায় লুকা জিদান: কালো মাস্কের নেপথ্যে যে চোট ও ফিরে আসার লড়াই

খেলাধুলা ডেস্ক

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আলজেরিয়ার মধ্যকার আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে দর্শকদের বাড়তি নজর কেড়েছেন আলজেরীয় গোলরক্ষক লুকা জিদান। তবে ম্যাচের পারফরম্যান্সের চেয়েও ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে বেশি কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে তার মুখমণ্ডল জুড়ে থাকা একটি বিশেষ কালো ফেস মাস্ক। ফ্রান্সের কিংবদন্তি ফুটবলার জিনেদিন জিদানের সন্তান লুকা জিদান কেন এই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে মাঠে নেমেছেন, তা নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধান ও চিকিৎসকদের সূত্র অনুযায়ী, এই মাস্ক ব্যবহারের পেছনে রয়েছে মাস কয়েক আগের এক গুরুতর শারীরিক চোট এবং তা থেকে দীর্ঘ পুনর্বাসনের ইতিহাস।

চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ক্লাব ফুটবলে একটি ম্যাচ চলাকালীন প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের শিকার হন ২৮ বছর বয়সী লুকা জিদান। মাঠেই গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পর তাকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, ওই সংঘর্ষের ফলে তার চোয়াল এবং থুতনির হাড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা ফ্র্যাকচার হয়েছে। এর পাশাপাশি মাথায় আঘাতজনিত অভ্যন্তরীণ জটিলতা (কনকাশন) দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। জরুরি ভিত্তিতে তার মুখমণ্ডলে জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয় এবং চিকিৎসকদের কঠোর তত্ত্বাবধানে তাকে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে অবস্থান করতে হয়।

মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ত্রোপচার সফল হলেও চোয়াল ও থুতনির স্পর্শকাতর হাড়গুলো পুরোপুরি পূর্বের অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। ফুটবল মাঠে পুনরায় বলের আঘাত বা অন্য খেলোয়াড়ের কনুইয়ের ধাক্কা লাগলে ওই স্থানটি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসকদের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও সতর্কতার অংশ হিসেবেই আন্তর্জাতিক ফুটবলের মতো উচ্চ-তীব্রতার ম্যাচে তার জন্য এই বিশেষ সুরক্ষামূলক গিয়ার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কার্বন ফাইবার বা সমমানের শক্ত উপাদানে তৈরি এই কালো মাস্কটি মূলত মুখমণ্ডলের ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল অংশগুলোকে বাহ্যিক চাপ থেকে রক্ষা করে এবং নতুন করে বড় ধরনের আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনে।

বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে মাঠে নামার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা ও মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে অবহিত করেছিলেন লুকা জিদান। তিনি জানান, অস্ত্রোপচারের পরবর্তী পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হলেও বর্তমানে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং মাঠে কোনো ধরনের শারীরিক অস্বস্তি বা ব্যথা অনুভব করছেন না। দীর্ঘ বিরতির পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে এবং মাঠে ফিরতে পেরে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের মাস্ক পরে খেলার ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের দৃষ্টিসীমা (পেরিফেরাল ভিশন) কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে, তবে আধুনিক প্রযুক্তির মাস্কগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় যা সুরক্ষার পাশাপাশি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে ন্যূনতম প্রভাব ফেলে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে লুকা জিদানের ক্যারিয়ারের পথচলা এবং জাতীয় দল নির্বাচনও বেশ ব্যতিক্রমী ও তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্রান্সে জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে তিনি ফরাসি অনূর্ধ্ব-১৭, অনূর্ধ্ব-১৮ এবং অনূর্ধ্ব-২০ সহ বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে খেলেন। তবে ফ্রান্সের মূল জাতীয় দলে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সিনিয়র পর্যায়ে তার নিয়মিত সুযোগ পাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার নিয়মানুযায়ী তিনি পারিবারিক শিকড়ের সূত্রে আলজেরিয়া জাতীয় ফুটবল দলকে বেছে নেন। লুকা জিদানের দাদা ও দাদি মূলত আলজেরীয় নাগরিক ছিলেন, যা তাকে উত্তর আফ্রিকার এই দেশটির হয়ে খেলার বৈধতা প্রদান করে।

চলতি ম্যাচে আলজেরিয়ার রক্ষণভাগ সামলানোর পাশাপাশি লুকা জিদানের এই মাস্ক পরিহিত উপস্থিতি কেবল একটি সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, এটি একজন অ্যাথলেটের পেশাদারিত্ব, মানসিক দৃঢ়তা এবং গুরুতর চোটের ধকল কাটিয়ে সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিযোগিতায় ফিরে আসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। চোটের কারণে অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার দীর্ঘমেয়াদে হুমকিতে পড়লেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক সহায়তা এবং ব্যক্তিগত ইচ্ছাশক্তির জোরে লুকা জিদান আন্তর্জাতিক ফুটবলের মূল স্রোতে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

খেলাধূলা শীর্ষ সংবাদ