জাতীয় ডেস্ক
বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দেশজুড়ে উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে শুরু করেছে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। একসময় মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা নতুন করে সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্রে (হটস্পট) পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে অন্তত ১৪টি জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের হার জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও কীটতত্ত্ববিদদের মতে, এখনই সমন্বিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে দেশব্যাপী ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঢাকার বাইরে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, মাদারীপুর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, কুমিল্লা, কক্সবাজার এবং চট্টগ্রামে এডিস মশার প্রজনন ও ডেঙ্গু সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঢাকার বাইরের এসব জেলা ও পৌর এলাকার অধিকাংশ স্থানেই মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি কিংবা সুনির্দিষ্ট বাজেটের তীব্র ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় সরকারের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসেবে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে মশা নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ, উন্নত সরঞ্জাম এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সঠিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত দেশজুড়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯ জন। বিভাগভিত্তিক আক্রান্তের সংখ্যার দিক থেকে এবার শীর্ষে অবস্থান করছে বরিশাল বিভাগ, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৭৩৫ জন। এর পরেই রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখানে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০১ জন। এছাড়া ঢাকা মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগে ৭৯৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৫৪৯ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৯৩১ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, কেবল জুন মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৯০৭ জন, যা পূর্ববর্তী মাসগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি এবং এটি ডেঙ্গু মৌসুমের তীব্রতা বৃদ্ধির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। বর্তমানে মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৭৭ দশমিক ১ শতাংশই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগ একাই মোট আক্রান্তের প্রায় ২৭ শতাংশ, যা দেশের সব বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। জেলা পর্যায়ের তথ্যানুযায়ী, পিরোজপুর, বরিশাল, চট্টগ্রাম, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালী জেলা বর্তমানে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার শীর্ষে রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গত দুই মাস ধরে সারা দেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের সঠিক ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা সচল রাখতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ও সিটি করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, এডিস মশার লার্ভা দ্রুত ধ্বংস করার জন্য একটি বিশেষ মেডিকেল ট্যাবলেট সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা ছোট ছোট জমে থাকা পানি, ডাবের খোসা কিংবা পরিত্যক্ত টায়ারে ব্যবহার করা হবে।
তবে মাঠপর্যায়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে দক্ষ কীটতত্ত্ববিদের অভাব। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে কেবল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে একজন স্থায়ী কীটতত্ত্ববিদ কর্মরত আছেন; অবশিষ্ট ১১টি সিটি করপোরেশনে এই পদের কোনো অস্তিত্ব নেই। অন্যদিকে, দেশের মাত্র ২৬টি জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়ে কীটতত্ত্ববিদের অনুমোদিত পদ রয়েছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বিভাগীয় পরিচালক কার্যালয় ও সদর দপ্তরসহ কীটতত্ত্ববিদদের অনুমোদিত ৩৩টি পদের মধ্যে অন্তত ১৮টি পদই বর্তমানে খালি পড়ে আছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন যে, মশার প্রজাতি, প্রজননস্থল, বিস্তার, কীটনাশকের কার্যকারিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করার জন্য কীটতত্ত্ববিদদের ভূমিকা অপরিসীম। তাদের কারিগরি পরামর্শ ছাড়া কেবল প্রথাগত ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জেলা শহর ও পৌর এলাকাগুলোর দুর্বল মশক নিধন ব্যবস্থার কারণে সংক্রমণ একবার গতি পেলে তা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস, যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। আগামী দুই মাসের সম্ভাব্য সংকট এড়াতে এখনই দেশব্যাপী একটি সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।


