জাতীয় ডেস্ক
দেশের সমৃদ্ধি ও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা পালনকারীদের অকপটে দায় স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী। একই সঙ্গে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন ভুলে দেশ গড়ার স্বার্থে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় ফিরে আসার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
শনিবার (১১ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত ‘রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ (রাওয়া) মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এ সব কথা বলেন। ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক এই সভার আয়োজন করে রাওয়া কর্তৃপক্ষ।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, “আমরা সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই এবং দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে চাই। এ জন্য যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন, তাদের নিজেদের ভুল ও বিতর্কিত ভূমিকা অকপটে স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে হবে। তারা এই ঐতিহাসিক সত্যকে মেনে না নিলে পুরো জাতি এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া কষ্টকর।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে দেশের প্রতিটি নাগরিক ও রাজনৈতিক পক্ষকে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করতে হবে।
আলোচনা সভায় মন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধের গোড়ার দিকের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করেন। তিনি জানান, ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জের তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তীতে জেনারেল) এম এ জি ওসমানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় সেনা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে যুদ্ধের নামকরণ ‘মুক্তিযুদ্ধ’ করার এবং যুদ্ধের সামগ্রিক নেতৃত্ব জেনারেল ওসমানীর হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। মন্ত্রী জানান, তেলিয়াপাড়ার সেই ঐতিহাসিক সভার স্মৃতি সংরক্ষণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করেছে এবং সেখানে একটি নামফলক স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় নিয়োজিত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ও অধিকার প্রদান করে, ঠিক তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা জীবন বাজি রেখে দায়িত্ব পালন করছেন, তাদের অবদানকেও আনুষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকারকারীদের সম্মান জানানোই রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালোরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস আক্রমণের মুখে যখন সমগ্র বাঙালি জাতি দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, তখন দেশের সামরিক ও বেসামরিক সাধারণ মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তিনি উল্লেখ করেন, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেই সংকটময় মুহূর্তে সাহসের সঙ্গে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, যা পরবর্তী সময়ে নিয়মতান্ত্রিক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি স্থাপন করে।
রাওয়া ক্লাবের চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আব্দুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত পদস্থ কর্মকর্তা, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।


