চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হেনস্তা, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার

চট্টগ্রামে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে হেনস্তা, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার

অপরাধ ডেস্ক

জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্য ও স্পিনার নাঈম হাসানকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধর এবং থানায় নিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানাধীন লালখান বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর শনিবার সকালে ভুক্তভোগী ক্রিকেটারের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশের এক তথ্যদাতাকে (সোর্স) আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের খেলা শেষ করে শুক্রবার রাতে বিমানযোগে চট্টগ্রামে পৌঁছান ক্রিকেটার নাঈম হাসান। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অটোরিকশাযোগে নিজ বাসায় ফেরার পথে লালখান বাজার এলাকায় পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি তাঁর গাড়ির গতিরোথ করেন। নাঈম হাসানের অভিযোগ, গাড়ি থামানোর পরপরই তাঁকে জোরপূর্বক নামিয়ে দেওয়া হয়। তিনি নিজের খেলোয়াড়সুলভ পরিচয়পত্র প্রদর্শন করা সত্ত্বেও কর্তব্যরত এসআই শফিকুল ইসলাম লাঠি দিয়ে তাঁকে আঘাত করেন। একই সময়ে সাদা পোশাকে থাকা পুলিশের এক সোর্স লোহার পাইপ দিয়ে তাঁকে মারধর করেন।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে নাঈম হাসান জানান, নিজেকে বারবার জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দিলেও অভিযান পরিচালনাকারী পুলিশ সদস্যরা তা আমলে নেননি। একপর্যায়ে ঘটনাস্থলে শতাধিক সাধারণ মানুষ জড়ো হয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করলেও মারধর বন্ধ করা হয়নি। উল্টো তাঁকে অপরাধী আখ্যা দিয়ে চুপ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। মারধর শেষে তাঁকে একটি অটোরিকশায় তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং পরবর্তীতে খুলশী থানায় নিয়ে গিয়ে পুনরায় হেনস্তা করা হয়। থানায় নিজের মুঠোফোন ফেরত পাওয়ার পর তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবালকে বিষয়টি অবহিত করেন। বিসিবি কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে পুলিশি আচরণের পরিবর্তন ঘটে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ছুটিতে থাকা খুলশী থানার অন্য এক এসআই মনিরুল ইসলামের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়েছিল। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, ওই অটোরিকশাটিতে করে একটি সোনার চোরাচালান বহন করা হচ্ছে। তবে সোনা চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধের তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হলেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পূর্বানুমতি নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, একটি অটোরিকশায় সোনা চোরাচালানের তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সদস্যরা সেখানে অভিযানে গিয়েছিলেন। তবে অভিযানের আগে নিয়ম মেনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা কতটুকু ছিল, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রাথমিক তদন্তে অভিযানের ক্ষেত্রে কিছু পদ্ধতিগত ভুলত্রুটি ও অপেশাদার আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ফলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এদিকে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এই অভিযানের বিষয়ে থানা প্রশাসনকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। থানায় নিয়ে আসার পর নাঈম হাসানের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেলে পুলিশের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। তবে ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও আইনগত পদক্ষেপ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ভুক্তভোগীর পরিবার থানা প্রাঙ্গণ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। পরবর্তীতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেলসহ অভিযানে অংশ নেওয়া অপর এক কনস্টেবলকে তাৎক্ষণিকভাবে ক্লোজড করে পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়।

ক্রিকেটার নাঈম হাসানের বাবা মাহবুবুল আলম এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষী পুলিশ সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ছেলের আটকের খবর পেয়ে রাতে থানায় ছুটে গেলে সেখানে কর্তব্যরত ডিউটি অফিসার তাঁর সঙ্গেও চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই খুলশী থানায় নাঈম হাসানের স্বজন, ক্রীড়া সংগঠক ও স্থানীয় ক্রিকেটপ্রেমীরা ভিড় করেন এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

খেলাধূলা শীর্ষ সংবাদ