এআই প্রযুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা ও নব্য-উপনিবেশবাদের উত্থান: বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ ও বৈষম্য

এআই প্রযুক্তিতে নিষেধাজ্ঞা ও নব্য-উপনিবেশবাদের উত্থান: বিশ্বজুড়ে বাড়ছে উদ্বেগ ও বৈষম্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়েছে। একদিকে বিশ্ববাসীর উন্মুক্ত ডেটা ব্যবহার করে বহুজাতিক টেক জায়ান্টরা তাদের শক্তিশালী এআই মডেল উন্নত করছে, অন্যদিকে নিরাপত্তার অজুহাতে সাধারণ ব্যবহারকারীদেরই সেই প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। অতি সম্প্রতি মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর তৈরি করা সবচেয়ে শক্তিশালী এআই মডেল ‘ক্লড ফেবল’ এবং ‘ক্লড মিথোস’ ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার।

নতুন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে বা বাইরে অবস্থানরত যেকোনো বিদেশি নাগরিকের জন্য এই মডেল দুটির ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই মডেলগুলোর প্রভূত ক্ষমতা ও কার্যকারিতা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এই সুরক্ষার যুক্তি দেখিয়ে এআই-কে এখন পারমাণবিক প্রযুক্তি বা স্যাটেলাইট সিস্টেমের মতোই একটি জাতীয় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে মার্কিন সরকার। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে বড় বড় এআই কোম্পানির অংশীদারিত্বের যে আলোচনা চলছে, তার ফলে চীন বা রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো এই এআই প্রযুক্তিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীরই একটি বর্ধিত রূপ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে, যা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তবে এই পুরো ব্যবস্থার নেপথ্যে গভীর বৈষম্য ও বাণিজ্যিকীকরণের চিত্র উঠে এসেছে। অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটা শিট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের পঞ্চম প্রজন্মের এই আধুনিক মডেলগুলো মূলত ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা কোটি কোটি সাধারণ মানুষের তথ্য, উন্মুক্ত ফোরাম, উইকিপিডিয়া ও গবেষণাপত্রের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে। মানবজাতির এই যৌথ জ্ঞানভাণ্ডারকে ব্যবহার করে মডেল তৈরির পর এখন তা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলা হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, যে জ্ঞান একসময় মুক্ত ও সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল, তা আজ একচেটিয়া কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণে বন্দি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের তথ্যে তৈরি এই প্রক্রিয়াজাত জ্ঞান পেতে হলে এখন বেসরকারি সংস্থাকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। সমাজ ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এই অবস্থাকে একটি ‘নব্য-সামন্ততান্ত্রিক সমাজ’ ব্যবস্থার সাথে তুলনা করছেন, যেখানে রাষ্ট্র ও কর্পোরেট পরাশক্তিগুলো একজোট হয়ে একটি বিশেষ জ্ঞান-অভিজাত শ্রেণি তৈরি করছে। ডেটা ব্যবহারের এই আইনি লড়াইয়ে গত বছরই অ্যানথ্রোপিককে অনুমতি ছাড়া বইপত্র ও মেধা সম্পত্তি ব্যবহারের অভিযোগে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অঙ্কের জরিমানা দিতে হয়েছে, যা এই প্রযুক্তির নৈতিক ভিত্তি ও তথ্যের উৎসের স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এই প্রযুক্তিগত আধিপত্যের নেতিবাচক প্রভাব ডিজিটাল দুনিয়া ছাড়িয়ে সরাসরি বাস্তব পরিবেশ এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনেও পড়ছে। একটি শক্তিশালী এআই মডেল সচল রাখতে বিশাল সব ডেটা সেন্টারের প্রয়োজন হয়, যার জন্য দরকার পড়ে বিপুল পরিমাণ জমি, বিদ্যুৎ এবং পানি। এই পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়াটিকে বিশেষজ্ঞরা উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক সম্পদ লুণ্ঠনের আধুনিক সংস্করণ বা ‘ডিজিটাল উপনিবেশবাদ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

দক্ষিণ এশিয়ায় এই পরিকাঠামো বিস্তারের বড় উদাহরণ ভারত। দেশটিতে বৈশ্বিক ক্লাউড পরিষেবা সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করতে ২০ বছরের বিশাল কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যার লক্ষ্য ভারতকে এআই পরিকাঠামোর একটি বড় হাব হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এর বড় খেসারত দিতে হচ্ছে স্থানীয় কৃষকদের। ডেটা সেন্টারের জন্য ফসলি জমি অধিগ্রহণ করায় ইতিমধ্যেই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কেবল এশিয়াতেই নয়, স্বয়ং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া, আইওয়া বা অ্যারিজোনার মতো এলাকাতেও এই পরিবেশগত আগ্রাসন এবং ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্থানীয় নাগরিক আন্দোলন শুরু হয়েছে।

প্রাকৃতিক সম্পদ ও স্থানীয় মানুষের অধিকার হরণ করে যে ডেটা সেন্টারগুলো গড়ে উঠছে, তার চূড়ান্ত মুনাফা চলে যাচ্ছে পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানির পকেটে। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ মানুষকে সেই ডিজিটাল সেবা আবার চড়া দামে কিনে নিতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঔপনিবেশিক আমলের সাথে আজকের এই নব্য-ডিজিটাল উপনিবেশবাদের পার্থক্য শুধু একটাই; অতীতে সম্পদ লুটের পেছনে সামরিক শক্তি বা জোর খাটানো হতো, আর আজ উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নামে উন্নয়নশীল দেশগুলো স্বেচ্ছায় এই ফাঁদে পা দিচ্ছে। এআই প্রযুক্তির এই অসম বণ্টন ও সম্পদ লুণ্ঠন দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যকে আরও তীব্র করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ