অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে সরকারকে বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক স্পট (খোলা) মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জরুরি ভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে দুই কার্গো এলএনজি আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বুধবার (১৭ জুন) অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। দেশের তাৎক্ষণিক জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং আসন্ন জুলাই মাসের প্রথমার্ধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা-২০২৫-এর বিধি ১০৫(৩)(ক) অনুসরণে আন্তর্জাতিক কোটেশন (আরএফকিউ) পদ্ধতিতে মূলত তিন কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব বৈঠকে উত্থাপন করা হয়েছিল। তবে বাজার পরিস্থিতি এবং আর্থিক সাশ্রয়ের বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আংশিক অনুমোদন দেয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তিন কার্গোর পরিবর্তে আপাতত দুই কার্গো এলএনজি কেনা হবে।
বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবিত তিন কার্গো এলএনজি ক্রয়ের জন্য মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ২ হাজার ১১২ কোটি ৬০ লাখ ৩৩ হাজার ৬৩৪ টাকা (অগ্রিম আয়কর বা এআইটি-সহ)। এর মধ্যে অনুমোদিত দুই কার্গো এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।
বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জানান, হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংকট বাংলাদেশের সামগ্রিক জ্বালানি খাতের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই সংকটের কারণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা জ্বালানির কিছু নির্ধারিত চালান সময়মতো দেশে পৌঁছাতে পারছে না। চলমান যুদ্ধ ও রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে চুক্তির ‘ফোর্স মেজর’ (অনিবার্য পরিস্থিতি) ধারা প্রয়োগ করছে। এই ধারার আওতায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহের আইনি দায় থেকে সাময়িক অব্যাহতি পায়। ফলে দেশের ভেতরে বড় ধরনের জ্বালানি ঘাটতি এড়াতে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চ মূল্যে গ্যাস কেনা ছাড়া সরকারের সামনে তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প ছিল না।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও স্পষ্ট করেন যে, এলএনজি আমদানির জন্য কার্গো ক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর তা প্রক্রিয়াজাতকরণ, সমুদ্রপথে পরিবহন এবং বন্দরে খালাস করতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। তাই জুন ও জুলাই মাসের চাহিদা সময়মতো মেটাতে এই আগাম ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি ছিল।
একটি কার্গো কম কেনার সিদ্ধান্তের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে এলএনজির দাম কিছুটা নিম্নমুখী। সরকার এই বাজার পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চায়। এই পর্যবেক্ষণকালীন সময়ের মধ্যে যদি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় থাকা কোনো স্থগিত চালান দেশে এসে পৌঁছায়, কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও কমে, তবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অতিরিক্ত অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। সরকারি অর্থ সাশ্রয়ের এই কৌশলগত দিকটি বিবেচনায় রেখেই তৃতীয় কার্গোটি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
স্পট মার্কেট থেকে আমদানিতব্য এই এলএনজির মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানানো হয় যে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন দরসূচক এবং পূর্ববর্তী কয়েক মাসের গড় দামের সামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করে এই ক্রয়মূল্য চূড়ান্ত করা হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। মন্ত্রিপরিষদ সচিবও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাবে বলে আশা প্রকাশ করলেও, এই সাম্প্রতিক সংকট দেশের সার্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাকে পুনরুল্লেখ করে।


