সংসদ ও রাজনীতি ডেস্ক
জাতীয় সমৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কৃষিখাতকে গড়ে তুলতে এবং প্রান্তিক কৃষকদের ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তায় রূপান্তর করতে সরকার বদ্ধপরিকর। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ ও ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’সহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
বুধবার (১৭ জুন) বিকালে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব তথ্য জানান। সিরাজগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজা এবং টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল আওয়ালের পৃথক দুটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সরকারের এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও চলমান কার্যক্রমের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
সংসদে উত্থাপিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য হলো একটি আত্মনির্ভরশীল, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং কৃষক-কেন্দ্রিক আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘আই হ্যাব অ্যা প্ল্যান’ কর্মসূচির আওতায় দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। কৃষকদের অনন্য পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায্য মূল্যে কৃষি উপকরণ, সরকারি ভর্তুকি, প্রণোদনা ও সহজ শর্তে আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রদানের লক্ষ্যে চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। দেশের ৮টি বিভাগের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লকে প্রাক-পাইলটিং পর্যায়ে ইতিমধ্যে ২০ হাজার ৮৩২টি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে।
কৃষকদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎস্যখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সম্পূর্ণ মওকুফ করেছে। এই ঋণ মওকুফ সুবিধা প্রদানের জন্য চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাজেটে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার ফলে দেশের প্রায় ১৩ লাখ ১৭ হাজার ৫০০ জন প্রান্তিক কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন। এছাড়া, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে, সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষিত করতে দেশব্যাপী ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে।
কৃষিখাতকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সরকার এখন প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে স্মার্ট কৃষি ও প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে কৃষিতে সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং ড্রোনের মতো চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছে। পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে শস্য সংগ্রহ ও দেশব্যাপী ‘কৃষকবাজার’ স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকি ও ভৌগোলিক কারণে দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশের সুরক্ষায় আরেকটি যুগান্তকারী উদ্যোগের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, গত ১৩ মে ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের প্রথম পর্যায় বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। এই বৃহৎ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীতে পানি সংরক্ষণ ও প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে, যা পদ্মানির্ভর অঞ্চলের নদী শাসন ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করবে।
প্রকল্পটির সুদূরপ্রসারী প্রভাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ হ্রাস পাবে, সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার হবে এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এছাড়া এই ব্যারেজ থেকে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা দেশের জাতীয় জিডিপিতে অতিরিক্ত ০.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করবে। একই সাথে উত্তরাঞ্চলের পানির সংকট নিরসনে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের কাজও সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাব মোকাবিলায় আগামী ৫ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের একটি বৃহৎ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি উপকূলীয় জেলাগুলোতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে সুপেয় পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গ্রামীণ প্রাকৃতিক জলাধার গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের অধীনে এই সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী সংসদকে অবহিত করেন।


