কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বাড়ছে ডিজিটাল জঞ্জাল: নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর উদ্যোগ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে বাড়ছে ডিজিটাল জঞ্জাল: নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর উদ্যোগ

তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক

সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করলেই এখন চোখে পড়ছে অবাস্তব ও অস্তিত্বহীন কিছু দৃশ্য, আর মিউজিক স্ট্রিমিং অ্যাপে বাজছে প্রিয় শিল্পীর কৃত্রিম কণ্ঠের গান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ‘এআই’ প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, ঠিক তেমনই ইন্টারনেট জগতে তৈরি করছে এক বিশাল ডিজিটাল জঞ্জাল, যা প্রযুক্তি বিশ্বে ‘এআই স্লপ’ (AI Slop) নামে পরিচিতি পেয়েছে। নিম্নমানের এআই-জেনারেটেড ছবি, ভিডিও এবং মেকি গানের এই জোয়ার ব্যবহারকারীদের স্বাভাবিক অনলাইন অভিজ্ঞতাকে ব্যাহত করছে।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া ও মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখন এআই কনটেন্টে সয়লাব। এই পরিস্থিতিকে অনেকে শিল্পবিপ্লবের সময়কার ধোঁয়াশার সঙ্গে তুলনা করছেন, যা প্রাথমিক অবস্থায় নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। সম্পূর্ণ এআই-মুক্ত ইন্টারনেট বর্তমান প্রেক্ষাপটে অসম্ভব হলেও, ব্যবহারকারীদের ফিড থেকে এই জঞ্জাল কমিয়ে আনতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নতুন কিছু ফিচার ও সেটিংস যুক্ত করতে শুরু করেছে।

আইডিয়া ও অনুপ্রেরণা খোঁজার জনপ্রিয় মাধ্যম পিন্টারেস্টে সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি কনটেন্ট আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবহারকারীদের ক্রমবর্ধমান অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটি ‘টিউনার’ (Tuner) নামক একটি নতুন ফিচার চালু করেছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের ফিডে এআই কনটেন্টের উপস্থিতি নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন। অ্যান্ড্রয়েড ও ডেস্কটপে চালুর পর বর্তমানে এটি আইওএস সংস্করণে ধাপে ধাপে যুক্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিউটি, আর্ট, ফ্যাশন এবং হোম ডেকোরেশন ক্যাটাগরিতে এই নিয়ন্ত্রণ সুবিধা সচল করা হয়েছে। ব্যবহারকারীরা অ্যাপের সেটিংস থেকে ‘রিফাইন ইয়োর রিকমেন্ডেশনস’-এ গিয়ে জেনএআই (GenAI) ইন্টারেস্ট ট্যাবের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির এআই কনটেন্ট কমিয়ে আনতে পারছেন।

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকেও এআই-জেনারেটেড ভিডিওর সংখ্যা শতকোটি ছাড়িয়েছে। ব্যবহারকারীদের ‘ফর ইউ’ ফিডে এই কনটেন্টের প্রভাব কমাতে টিকটক একটি বিশেষ স্লাইডার যুক্ত করেছে। ব্যবহারকারীরা অ্যাপের সেটিংসের ‘কনটেন্ট প্রেফারেন্সেস’ থেকে ‘ম্যানেজ টপিকস’-এ গিয়ে এআই কনটেন্ট প্রদর্শনের মাত্রা হ্রাস বা বৃদ্ধি করতে পারছেন। এছাড়া সরাসরি ভিডিওর শেয়ার অপশন থেকে ‘হোয়াই দিস ভিডিও’ হয়েও এই সেটিংস পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে।

ডিজিটাল সংগীতের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও ঘনীভূত। সুনো বা উডিও-র মতো আধুনিক টুল ব্যবহার করে সাধারণ কিছু টেক্সট কমান্ডের মাধ্যমেই এখন তৈরি হচ্ছে পেশাদার মানের সুর ও গান। এর ফলে মিউজিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো কৃত্রিম গানের জোয়ারে ভাসছে। ইউরোপভিত্তিক মিউজিক স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠান ‘ডিজার’-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন তাদের প্ল্যাটফর্মে আপলোড হওয়া গানের প্রায় ৩৯ শতাংশই (প্রায় ৬০ হাজার গান) সম্পূর্ণ এআই-তৈরি। গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৩৪ লাখেরও বেশি এআই ট্র্যাক শনাক্ত করে সেগুলোকে আলাদাভাবে লেবেল করেছে। মূলত কৃত্রিম উপায়ে স্ট্রিম বা ভিউ বাড়িয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যেই এই চক্রগুলো সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

এই কৃত্রিম জঞ্জাল থেকে বাঁচতে বিশ্বজুড়ে এখন বিকল্প ও এআই-মুক্ত প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। চিত্রশিল্পীদের জন্য তৈরি ‘কারা’ (Cara) নামক পোর্টফোলিও প্ল্যাটফর্মে এআই-তৈরি কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইনস্টাগ্রামের বিকল্প হিসেবে পরিচিত ‘পিক্সেলফেড’ (Pixelfed) এবং মানুষের মৌলিক চিন্তাধারা প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম ‘স্প্রেড’ (Spread) সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। এছাড়া নতুন ভিডিও অ্যাপ ‘ডিভাইন’ (diVine) একাধিক উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের প্ল্যাটফর্মকে সম্পূর্ণ ‘এআই স্লপ’ মুক্ত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কেবল ব্যবহারকারীর সচেতনতাই যথেষ্ট নয়, বরং মূলধারার প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদমিক পরিবর্তন এবং কঠোর নীতিমালা প্রয়োগই ডিজিটাল মাধ্যমের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পারে।

তথ্য প্রুযুক্তি শীর্ষ সংবাদ