ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: তেহরানের বিজয় ও যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে স্পিকারের ঘোষণা

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ: তেহরানের বিজয় ও যুদ্ধবিরতি প্রসঙ্গে স্পিকারের ঘোষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক সপ্তাহব্যাপী সামরিক সংঘাতের পর ইরান ‘মাঠে বিজয়ী’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। গত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম উত্তপ্ত এই পরিস্থিতির পর এক রাষ্ট্রীয় ভাষণে গালিবাফ জানান, শত্রু পক্ষ তেহরানের আরোপিত শর্তসমূহ মেনে নেওয়ায় ইরান সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

জাতীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ভাষণে মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে যুদ্ধের ফলাফল তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, সামরিক ময়দানে তেহরান তার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে এবং প্রতিপক্ষের কৌশলগত পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছে। স্পিকারের দাবি অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এই যুদ্ধে তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের সমঝোতার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে।

ইরানি স্পিকারের বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধের প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান পথ ‘হরমুজ প্রণালি’র ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা তেহরানের জন্য কেবল সামরিক নয়, বরং একটি বড় রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গালিবাফ স্পষ্ট করেন যে, ইরান কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করেনি। তিনি বলেন, “আমরা যদি যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়ে থাকি, তাহলে তা শুধু এই কারণে যে তারা আমাদের শর্তগুলো মেনে নিয়েছে।” তার মতে, শত্রুপক্ষ শুরু থেকেই তেহরানের ওপর নিজেদের একতরফা শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা ইরান শক্ত হাতে প্রতিহত করেছে। এই অবস্থান থেকে সরে এসে ওয়াশিংটন যখন তেহরানের দাবিগুলো বিবেচনায় নিতে শুরু করে, তখনই কেবল অস্ত্রবিরতির পথ প্রশস্ত হয়।

আলোচনা এবং কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে তিনি যুদ্ধেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অভিহিত করেন। স্পিকারের মতে, অধিকার আদায়ের লড়াই কেবল রণক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নেগোশিয়েশন বা আলোচনা হচ্ছে সেই সংগ্রামেরই একটি কৌশলগত রূপ। তিনি আরও যোগ করেন যে, শত্রুপক্ষের ওপর নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ইরানের জন্য একটি অপরিহার্য অগ্রাধিকার ছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রতিফলন।

বিশ্লেষকদের মতে, গালিবাফের এই মন্তব্য ইরানের অভ্যন্তরীণ জনমতকে সুসংহত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের সামরিক শক্তিমত্তার বার্তা দেওয়ার একটি প্রচেষ্টা। দীর্ঘদিনের অবরোধ এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে সামরিক অবস্থান ধরে রাখা এবং নিজেদের শর্তে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করাকে ইরান তাদের পররাষ্ট্রনীতির বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে। তবে এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে উভয় পক্ষের শর্ত পালনের সদিচ্ছা এবং হরমুজ প্রণালিসহ সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে পরবর্তী সামরিক গতিবিধির ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবির বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত বড় ধরনের সংঘর্ষ থামলেও দুই দেশের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন যে সহসাই শেষ হচ্ছে না, গালিবাফের বক্তব্য তারই ইঙ্গিত বহন করে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ