আন্তর্জাতিক ডেস্ক
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় কথিত যুদ্ধবিরতির আলোচনা ও আবহের মধ্যেই ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলায় অন্তত ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে পুলিশের সদস্য ও সাধারণ পথচারী রয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গাজা উপত্যকার বিভিন্ন প্রান্তে এসব হামলা চালানো হয়। গাজার চিকিৎসা সূত্র ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় একটি পুলিশের গাড়িকে লক্ষ্য করে সরাসরি হামলা চালায় ইসরায়েলি বিমান। এতে ঘটনাস্থলেই আটজন প্রাণ হারান। নিহতদের মধ্যে তিনজন সাধারণ পথচারী ছিলেন বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পুলিশের গাড়িটি যখন সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই অতর্কিতভাবে এই হামলা চালানো হয়।
একই দিনে গাজা সিটিতে পৃথক এক অভিযানে দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়, যাতে তারা দুজনেই নিহত হন। এছাড়া উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে বোমা হামলায় আরও দুই ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। এসব হামলার ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন, যাদের স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, খান ইউনিসে পুলিশের গাড়িটি যখন একটি স্থানীয় বিবাদ নিরসনে হস্তক্ষেপ করছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, ইসরায়েলি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলায় নিয়োজিত কর্মকর্তাদের হত্যা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রণালয় বলেছে, বেসামরিক এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর ওপর এই বর্বরতা বন্ধে অবিলম্বে কার্যকর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, গাজা পুলিশ একটি অরাজনৈতিক বেসামরিক বাহিনী হিসেবে জনগণের দৈনন্দিন সেবায় নিয়োজিত। তাদের ওপর হামলা চালানোর কোনো আন্তর্জাতিক বা নৈতিক বৈধতা নেই। গাজার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নীরবতা ইসরায়েলি দখলদার শক্তিকে যুদ্ধাপরাধ চালিয়ে যেতে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করছে। ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করার পাশাপাশি স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলোকে মদত দিয়ে অঞ্চলে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও বিবৃতিতে দাবি করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের ফলে অঞ্চলটির প্রশাসনিক কাঠামো চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই আগ্রাসনের সময় ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের ওপর নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েলি বাহিনী। এর ফলে ত্রাণ লুটপাটের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উপত্যকাজুড়ে খাদ্য ও জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অনুপস্থিতিতে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে চরমে পৌঁছে দিয়েছে।
চলমান এই সহিংসতা গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলছে। একদিকে কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় আলোচনার খবর পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে ভূখণ্ডটিতে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান ও বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে। চলমান এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে আসছে যে, বেসামরিক অবকাঠামো এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর এই ধরনের হামলা জেনেভা কনভেনশনসহ আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।


