ক্রীড়া ডেস্ক
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব লিভারপুলের জার্সিতে মিশরীয় তারকা ফরোয়ার্ড মোহামেদ সালাহর দীর্ঘ ৯ বছরের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় কি তবে অনাকাঙ্ক্ষিত এক চোটের মাধ্যমেই শেষ হয়ে গেল? গত শনিবার ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে ম্যাচে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়ার পর এমন প্রশ্নই এখন ফুটবল বিশ্বে জোরালো হয়ে উঠেছে। চলতি মৌসুম শেষে সালাহর ক্লাব ছাড়ার বিষয়টি আগেই নিশ্চিত ছিল, তবে ইনজুরির ধরণ ও সেরে ওঠার সময়সীমা বিবেচনায় ধারণা করা হচ্ছে, অলরেডদের হয়ে নিজের শেষ ম্যাচটি তিনি ইতোমধ্যেই খেলে ফেলেছেন।
ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে ৩-১ ব্যবধানে জয় পাওয়া ম্যাচটিতে লিভারপুলের হয়ে শুরুর একাদশেই ছিলেন ৩৩ বছর বয়সী এই তারকা। তবে ম্যাচের ৫৯ মিনিটে হ্যামস্ট্রিংয়ে টান লাগলে তিনি মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সালাহ গ্যালারিতে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান, যা অনেক সমর্থকের কাছেই তার সম্ভাব্য বিদায়ী সংকেত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজারো ভক্তও দাঁড়িয়ে এই কিংবদন্তিকে করতালি দিয়ে সম্মান জানান।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে লিভারপুলের প্রধান কোচ আর্নে স্লট সালাহর চোট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সালাহর হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে সেরে উঠতে ঠিক কতদিন সময় লাগবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। চলতি মৌসুম শেষ হতে আর মাত্র চার সপ্তাহ বাকি আছে উল্লেখ করে স্লট বলেন, “আমাদের হাতে সময় খুব কম। সালাহর চোট কতটা গুরুতর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা যাবে। তবে এই অল্প সময়ের মধ্যে তার পুনরায় মাঠে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।” সালাহকে পুনরায় লিভারপুলের জার্সিতে দেখার আশা প্রকাশ করলেও কোচের কণ্ঠে কিছুটা শঙ্কার সুর ছিল। তিনি যোগ করেন, “সালাহ যখন মাঠ ছাড়ছিলেন, তখন আমারও মনে হচ্ছিল এটিই হয়তো তার শেষ ম্যাচ। তবে সে নিজের শরীরের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল, তাই আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তার ফেরার অপেক্ষায় থাকব।”
সালাহর ইনজুরি নিয়ে আরও সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়েছেন মিশর জাতীয় দলের পরিচালক ইব্রাহিম হাসান। তার মতে, এই চোট থেকে পুরোপুরি সেরে উঠতে কমপক্ষে চার সপ্তাহ সময় প্রয়োজন। যেহেতু প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান মৌসুম আগামী ২৪ মে শেষ হতে যাচ্ছে, তাই ক্লাব ফুটবলে এই মৌসুমে সালাহর আর ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ বললেই চলে। তবে ইব্রাহিম হাসান আশা প্রকাশ করেছেন যে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগেই সালাহ পুরোপুরি ফিট হয়ে উঠবেন। আগামী ১১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বৈশ্বিক আসরে ‘জি’ গ্রুপে মিশরের প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছে বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড ও ইরান।
লিভারপুলের হয়ে সালাহর এই মৌসুমটি ছিল মিশ্র অভিজ্ঞতার। মাঠের পারফরম্যান্স এবং কোচের সঙ্গে মতবিরোধ মিলিয়ে কিছুটা চাপে ছিলেন তিনি। এই মৌসুমে লিগ ফুটবলে তিনি মাত্র ৭টি গোল করেছেন, যা ২০১৭ সালে অ্যানফিল্ডে যোগ দেওয়ার পর থেকে তার ক্যারিয়ারের সর্বনিম্ন পরিসংখ্যান। তবে সামগ্রিকভাবে লিভারপুলের ইতিহাসে তার অবদান অবিস্মরণীয়। ২০১৭ সালে ইতালিয়ান ক্লাব রোমা থেকে যোগ দেওয়ার পর তিনি ক্লাবটির হয়ে ৪৩৫টি ম্যাচ খেলেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে ২৫৭টি গোল করে তিনি লিভারপুলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তৃতীয় স্থানে নিজের নাম লিখিয়েছেন। তার সামনে রয়েছেন কেবল ইয়ান রুশ (৩৪৬ গোল) এবং রজার হান্ট (২৮৫ গোল)।
মোহামেদ সালাহ কেবল একজন ফুটবলার হিসেবে নন, বরং লিভারপুলের পুনর্জাগরণের অন্যতম কাণ্ডারি হিসেবেই সমর্থকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তার অধীনে ক্লাবটি প্রিমিয়ার লিগ ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য শিরোপা জয় করেছে। ইনজুরির কারণে মাঠের লড়াইয়ে তার বিদায়টা কিছুটা ম্লান হলেও, প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা উইঙ্গার হিসেবেই তার নাম উচ্চারিত হবে। এখন দেখার বিষয়, আগামী কয়েক সপ্তাহের নিবিড় পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে তিনি কি শেষবারের মতো অলরেডদের জার্সিতে মাঠে নামার সুযোগ পাবেন, নাকি ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে সেই বিষাদময় প্রস্থানই হবে তার লিভারপুল ক্যারিয়ারের শেষ স্মৃতি।


