আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় (ইউএসএফ) অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মর্মান্তিক মৃত্যু এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের মূল সন্দেহভাজন হিসেবে লিমনের রুমমেট, মার্কিন নাগরিক হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ। প্রাথমিক তদন্ত ও আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ড অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং নৃশংস ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত ২৪ এপ্রিল ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের কাছ থেকে জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর আগে প্রায় ১০ দিন ধরে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, লিমনের শরীরে একাধিক গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে, যা কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রসিকিউটররা একে একটি ‘নির্মম হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। লিমনকে হত্যার পর তার মরদেহ লোকচক্ষুর আড়ালে ফেলে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, লিমনের সহপাঠী ও বন্ধু নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তবে তদন্তকারীরা আশঙ্কা করছেন, লিমনকে হত্যার সময় বা এর কাছাকাছি সময়ে নাহিদাকেও হত্যা করা হয়েছে। অভিযুক্ত হিশাম আবুঘরবেহ ও লিমনের যৌথ ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রচুর পরিমাণে রক্তের ছোপ খুঁজে পেয়েছেন। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা গেছে, সেই রক্তের ডিএনএ নমুনার সঙ্গে নিখোঁজ নাহিদা বৃষ্টির ডিএনএ প্রোফাইলের মিল রয়েছে। এই শক্তিশালী ফরেনসিক প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ মনে করছে, লিমন ও নাহিদা দুজনকেই একই অ্যাপার্টমেন্টে হত্যা করে পরবর্তীতে মরদেহ সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
২৬ বছর বয়সী অভিযুক্ত হিশাম আবুঘরবেহ’র বিরুদ্ধে এরই মধ্যে দুটি প্রথম-ডিগ্রি পরিকল্পিত হত্যার (First-degree Premeditated Murder) অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে মরদেহ গুম, তথ্য-প্রমাণ নষ্ট করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা এবং প্রাণঘাতী হামলার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ দায়ের করেছে হিলসবরো কাউন্টি শেরিফ অফিস। অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কোনো জামিন ছাড়াই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। বর্তমানে হিলসবরো কাউন্টি পাবলিক ডিফেন্ডার অফিস থেকে তার পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
প্রসিকিউশনের আবেদনে বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই অপরাধের ধরন অত্যন্ত সহিংস ও অমানবিক। অভিযুক্ত হিশামকে সমাজের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে বর্ণনা করে প্রসিকিউটররা আদালতকে জানিয়েছেন, তাকে জামিন দেওয়া হলে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। মামলার গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায় পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত তাকে কড়া পাহারায় কারাগারে রাখা হবে।
এই ঘটনাটি ফ্লোরিডার বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে এমন ট্র্যাজেডির শিকার হওয়া নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। তদন্তকারীরা এখন হত্যার সঠিক মোটিভ বা উদ্দেশ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন। লিমনের সঙ্গে তার রুমমেট হিশামের কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ ছিল কি না, নাকি এটি পূর্বপরিকল্পিত কোনো জাতিগত বিদ্বেষ বা অন্য কোনো কারণ থেকে উদ্ভূত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশি দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচারের দাবি জানানো হয়েছে। স্থানীয় বাংলাদেশি সংগঠনগুলো এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন আইন অনুযায়ী প্রথম-ডিগ্রি হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি সর্বোচ্চ শাস্তিরও বিধান রয়েছে। নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মরদেহের সন্ধানে স্থানীয় নদী ও দুর্গম এলাকাগুলোতে তল্লাশি অভিযান অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। নিখোঁজ শিক্ষার্থীর পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া আরও জোরদার করা হয়েছে। এই নৃশংস ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে মার্কিন বিচার বিভাগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।


