যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা: যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের বাধ্যবাধকতা এড়ালেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা: যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের বাধ্যবাধকতা এড়ালেন ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে চলমান সামরিক সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন। গত শুক্রবার মার্কিন কংগ্রেসের নেতাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তেহরানের সঙ্গে শত্রুতার অবসান ঘটেছে। মূলত মার্কিন সংবিধানে বর্ণিত প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং কংগ্রেসের আগাম অনুমতির বাধ্যবাধকতা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই এই ঘোষণা দিলেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর মধ্যে কোনো ধরনের গোলাগুলি বা সরাসরি সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, “২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসান হয়েছে।” এই ঘোষণার মাধ্যমে তিনি মূলত এটিই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন যে, বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সক্রিয় যুদ্ধাবস্থা নেই, ফলে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের জন্য এই মুহূর্তে কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন পড়ছে না।

এই আইনি ব্যাখ্যার নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ঐতিহাসিক ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলুশন’। এই আইন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত বিদেশি কোনো শক্তির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে পারেন। নির্দিষ্ট এই সময়সীমা পার হওয়ার পর অভিযান অব্যাহত রাখতে হলে কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক সম্মতি প্রয়োজন হয়। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট এই মেয়াদ আরও ৩০ দিন বাড়ানোর অনুরোধ করতে পারেন।

গত ১ মার্চ ইরানের ওপর অতর্কিত বিমান হামলা শুরু করার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিল। সেই হিসেবে আইনত নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা গত ১ মে শেষ হয়েছে। কংগ্রেসের অনেক সদস্য আশা করেছিলেন, এই সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য আইনসভার দ্বারস্থ হবেন। কিন্তু ট্রাম্প যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা দিয়ে সেই আইনি বাধ্যবাধকতাকে পাশ কাটিয়ে গেলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশলটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। সংঘাতকে ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা করার মাধ্যমে তিনি মূলত গত দুই মাস ধরে চলা অভিযানের আইনি বৈধতা নিশ্চিত করলেন এবং একই সঙ্গে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকার সুযোগ পেলেন। যদি ভবিষ্যতে পুনরায় কোনো সংঘাত শুরু হয়, তবে প্রশাসন সেটিকে নতুন প্রেক্ষাপট হিসেবে দাবি করে আবারও নতুন করে ৬০ দিনের আইনি সুরক্ষা লাভের সুযোগ পাবে।

তবে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে প্রেসিডেন্টের এই একক সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের আইনপ্রণেতাদের মতে, এটি মূলত যুদ্ধ ক্ষমতা আইনকে পাশ কাটানোর একটি প্রশাসনিক কৌশল। তারা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে প্রেসিডেন্টের একক সিদ্ধান্তের চেয়ে কংগ্রেসের সাথে সমন্বয় করা বেশি জরুরি। অন্যদিকে, হোয়াইট হাউস দাবি করছে, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেই ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি ত্বরান্বিত করেছে।

এই ঘোষণার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। দুই মাসব্যাপী এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর কিছুটা প্রশমিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ইরান এই যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আগামী দিনগুলোতে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক কোন পথে হাঁটবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আপাতত হোয়াইট হাউসের এই পদক্ষেপের ফলে আইনি লড়াইয়ের সম্ভাবনা কমে গেলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে কংগ্রেস যদি মনে করে প্রেসিডেন্ট তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, তবে আগামীতে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বাজেট বা অন্যান্য নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে প্রশাসনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে। তবে এই মুহূর্তের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সামরিক তৎপরতার একটি পর্যায়ের সমাপ্তি ঘটল বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ