আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘ চার বছর ধরে চলমান রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অবসানে মার্কিন মধ্যস্থতায় তিন দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। গত ৯ থেকে ১১ মে প্রস্তাবিত এই বিরতির মধ্যেই উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে ভয়াবহ হামলা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। কূটনৈতিক এই ব্যর্থতার সমান্তরালে রাশিয়া তাদের নৌবহরে ‘খাবারভস্ক’ নামক অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিশেষায়িত পারমাণবিক সাবমেরিন যুক্ত করায় কৃষ্ণসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে স্নায়ুযুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
ইউক্রেনীয় প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় অন্তত তিন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এক বিবৃতিতে জানান, কৌশলগতভাবে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সাময়িকভাবে কমলেও ফ্রন্টলাইন বা সম্মুখ সমরে রুশ বাহিনীর আক্রমণ অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রণাঙ্গনে ২১০টিরও বেশি পৃথক সংঘর্ষের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। পাল্টা জবাবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইউক্রেনের ৫৭টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে এবং কিয়েভের উসকানির ‘যথাযথ জবাব’ দিচ্ছে।
লড়াইয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলেও মানবিক কারণে বন্দি বিনিময়ের একটি প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে উভয় দেশের প্রায় এক হাজার যুদ্ধবন্দি বিনিময়ের বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। তবে শান্তি আলোচনার মৌলিক শর্ত নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে ব্যবধান এখনো আকাশচুম্বী। ক্রেমলিন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, আলোচনার টেবিলে বসার আগে ইউক্রেনকে নির্দিষ্ট কিছু ভূখণ্ড রাশিয়ার অংশ হিসেবে মেনে নিতে হবে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ শেষের দিকে বলে ইঙ্গিত দিলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে জার্মানি রাশিয়ার একটি প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব ফুটে উঠেছে। এই জটিলতা নিরসনে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মস্কো সফরের কথা রয়েছে, যারা ইতিমধ্যে মায়ামিতে ইউক্রেনের আলোচক রুস্তেম উমেরভের সাথে প্রাথমিক বৈঠক সেরেছেন।
কূটনৈতিক এই টানাপোড়েনের মধ্যেই রাশিয়ার সামরিক শক্তির নতুন প্রদর্শনী পশ্চিমা দেশগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। রাশিয়ার শিপইয়ার্ড থেকে সম্প্রতি উন্মোচন করা হয়েছে ১৩৫ মিটার দীর্ঘ ‘খাবারভস্ক’ সাবমেরিন। স্যাটেলাইট চিত্র ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত রাশিয়ার বহুল আলোচিত ‘পসেইডন’ পারমাণবিক টর্পেডো বহন করার জন্য তৈরি। পসেইডন কোনো সাধারণ অস্ত্র নয়; এটি একটি পারমাণবিক চুল্লিচালিত ড্রোন বা টর্পেডো, যা সমুদ্রের তলদেশে প্রায় ১ কিলোমিটার গভীরতা দিয়ে ঘণ্টায় ১৩০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে সক্ষম। এর পাল্লা কার্যত সীমাহীন হওয়ায় এটি শত্রুদেশের উপকূলীয় শহরগুলোতে অলক্ষ্যে আঘাত হেনে ভয়াবহ তেজস্ক্রিয় সুনামি তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবারভস্ক সাবমেরিনটি রাশিয়ার ‘ডেড হ্যান্ড’ বা ‘পেরিমিটার’ ব্যবস্থার অংশ। এর অর্থ হলো, কোনো কারণে রাশিয়ার মূল কমান্ড সেন্টার ধ্বংস হয়ে গেলেও এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাটি মার্কিন বা পশ্চিমা দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম হবে। রাশিয়া তাদের উত্তর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌবহরের জন্য মোট ৩০টি পসেইডন টর্পেডো এবং ৪টি বিশেষ সাবমেরিন তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
রাশিয়ার এই নৌ-সামরিক অগ্রগতি পেন্টাগনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতেই রাশিয়া সমুদ্রের তলদেশকে বেছে নিয়েছে। বর্তমানে মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে এই গভীরতায় চলাচলে সক্ষম টর্পেডোকে আটকানোর মতো কার্যকর দূরপাল্লার কোনো ‘স্ট্যান্ড-অফ’ অস্ত্র নেই। ১৯৯২ সালে ‘সাবরক’ অ্যান্টি-সাবমেরিন মিসাইল অবসরে পাঠানোর পর এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর কেবল আঞ্চলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে কূটনৈতিক স্থবিরতা এবং অন্যদিকে গভীর সমুদ্রে রাশিয়ার এই বিধ্বংসী অস্ত্রের মোতায়েন বিশ্বকে এক নতুন ও অনিশ্চিত সামরিক প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। শান্তি চুক্তির চেয়ে বর্তমানে উভয় পক্ষের সামরিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাই প্রবল হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব পড়তে পারে কয়েক দশকের ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর।


