আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সাম্প্রতিক সামরিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের সমীকরণ বিশ্লেষণ করে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক প্রধান গিওরা আইল্যান্ড দাবি করেছেন, চলমান পরিস্থিতিতে ইরানই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে একটি গভীর কৌশলগত সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
সম্প্রতি ইসরায়েলের স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার এই স্পষ্ট মূল্যায়ন তুলে ধরেন। গিওরা আইল্যান্ডের মতে, ইরান হয়তো খুব বড় ব্যবধানে জয়ী হয়নি, কিন্তু সামগ্রিক কৌশলগত দিক বিবেচনায় এটি তাদের একটি সুস্পষ্ট বিজয়। পুরো সংঘাত জুড়ে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে, যা তাদের আঞ্চলিক সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ।
এই সংঘাতের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আইল্যান্ড উল্লেখ করেন, মাঠপর্যায়ের এই সাফল্য বৈশ্বিক কূটনীতিতে তেহরানের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে ওয়াশিংটন এবং তার পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক আলোচনা বা চুক্তির ক্ষেত্রে ইরান এখন অনেক বেশি সুবিধাজনক ও শক্ত অবস্থানে থেকে দরকষাকষি করার সুযোগ পাবে।
সাক্ষাৎকারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হয়। ইসরায়েলের সাবেক এই নিরাপত্তা প্রধানের দাবি, ওয়াশিংটন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে একটি “স্পষ্ট কৌশলগত সংকটের” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বর্তমান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করে জানান, বিশ্বশক্তির মূল মনোযোগ এখন যেকোনো উপায়ে এই অঞ্চলের যুদ্ধ বা সংঘাত থামানোর দিকে। ফলে দীর্ঘদিনের প্রধান এজেন্ডা—অর্থাৎ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি প্রতিরোধ করার বিষয়টি এখন আর পশ্চিমাদের প্রাথমিক অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। সুরক্ষার এই শিথিলতা ইরানের পরমাণু সক্ষমতা অর্জনের পথকে আরও মসৃণ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিকে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নয়, বরং ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন গিওরা আইল্যান্ড। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে ইরানের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা আঞ্চলিক দেশগুলোর কাছে আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা কৌশল এবং ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা—উভয় ক্ষেত্রেই এক ধরণের বড় স্থবিরতা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার মুখ থেকে ইরানের এই বিজয় ও নিজেদের কৌশলগত সংকটের স্বীকারোক্তি অত্যন্ত বিরল। এটি প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত শক্তি সাম্যের ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যেখানে প্রথাগত সামরিক জোটগুলোর চেয়ে সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রতিরোধ নীতি বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।


