অপরাধ ডেস্ক
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী রামিসাকে (৮) ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে আজই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করতে যাচ্ছে পুলিশ। মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে আজ রবিবার দুপুরের দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এই অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
পল্লবী থানার মামলা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুটির ফরেনসিক ও ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান জানান, শনিবার রাতে ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন পুলিশের হাতে এসে পৌঁছেছে। এরপরই অভিযোগপত্র প্রস্তুতের বাকি কাজ সম্পন্ন করা হয় এবং আজ রবিবার তা আদালতে দাখিল করার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
পুলিশ এবং আদালত সূত্রে জানা যায়, নিহত রামিসা স্থানীয় পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। গত ১৯ মে সকালে নিজ বাসা থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা তাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে ভবনের অন্য একটি ফ্ল্যাটের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পেয়ে সন্দেহ হলে তিনি ডাকাডাকি করেন। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দা ও রামিসার বাবার সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন তারা। সেখানে তল্লাশি চালিয়ে শয়নকক্ষের মেঝেতে শিশুটির মস্তকবিহীন দেহ এবং ঘরের ভেতরে থাকা একটি বড় বালতির মধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর পরই জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এর মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে পল্লবী থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় এবং ওই ফ্ল্যাট থেকে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে হেফাজতে নেয়। তবে ঘটনার পর পরই প্রধান অভিযুক্ত সোহেল রানা কৌশলে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত ২০ মে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পর গ্রেফতারকৃত প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। গত ২০ মে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া সেই জবানবন্দিতে তিনি নিজের অপরাধের কথা বিস্তারিতভাবে স্বীকার করেন। জবানবন্দিতে আসামি জানান, ঘটনার পূর্বে তিনি ইয়াবা নামক মাদক সেবন করেছিলেন এবং মাদকাসক্ত অবস্থায় এই অপরাধ সংঘটন করেন।
স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার কৌশলে তাকে তাদের ঘরের ভেতর নিয়ে যান। এরপর সোহেল রানা শিশুটিকে বাথরুমে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেন। ধর্ষণের শিকার হয়ে শিশুটি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে, ঠিক সেই সময়েই রামিসার মা বাইরে থেকে দরজায় কড়া নাড়তে শুরু করেন। ধরা পড়ার ভয়ে এবং অপরাধ আড়াল করতে সোহেল রানা বাথরুমের ভেতরেই ধারালো ছুরি দিয়ে রামিসাকে গলা কেটে হত্যা করেন। জবানবন্দিতে তিনি আরও উল্লেখ করেন, মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে তিনি রামিসার মাথা শরীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক কেটে ফেলেন। এরপর দেহটি বাথরুম থেকে এনে শয়নকক্ষের খাটের নিচে লুকিয়ে রাখেন। এই পুরো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সময় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার একই ঘরে উপস্থিত ছিলেন এবং তাকে সহযোগিতা করেছিলেন। পরবর্তীতে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল রানা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আসামির স্বীকারোক্তি, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত আলামত এবং ডিএনএ টেস্টের রিপোর্টের ভিত্তিতে অত্যন্ত সুচারুভাবে এই চার্জশিট গঠন করা হয়েছে। জবানবন্দিতে আসামি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো শত্রুতা বা বিরোধ ছিল না; মূলত মাদকাসক্তি এবং আকস্মিক অপরাধপ্রবণতা থেকেই এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। দ্রুততম সময়ে অভিযোগপত্র দাখিলের মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হবে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।


