আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ মোজতবা খামেনির সঙ্গে বৈঠক করার প্রস্তাবটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নতুন সামরিক বা অর্থনৈতিক আগ্রাসন চালানো হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি এক সাক্ষাৎকারে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এই অচলাবস্থা এবং ভবিষ্যৎ সামরিক কৌশলের বিষয়ে তেহরানের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন।
মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার কোনো বৈঠকের সম্ভাবনা নেই। ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের বৈরী পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে এক অন্ধকার ও অন্তহীন সুড়ঙ্গের দিকে ঠেলে দেবে। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের চেয়ে যেকোনো দেশের জন্য আলোচনার টেবিলে বসা সাশ্রয়ী, যা মার্কিন প্রশাসনের বোঝা উচিত। তবে আলোচনার জন্য তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হলে ইরান তার সামরিক ও কৌশলগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করবে।
ইরানের অবকাঠামো লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান হুমকির জবাবে এই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জানান, সংঘাত বৃদ্ধি পেলে তা কেবল আঞ্চলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইরান এই প্রতিরোধের পরিধি ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার কৌশলগত প্রস্তুতি রেখেছে। এই জলপথগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট হওয়ায়, এখানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্য তা মারাত্মক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
এর আগে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়। এর জবাবে ইরান এই অঞ্চলে মার্কিন ও ইসরায়েলি কৌশলগত অবস্থানগুলোতে প্রায় ১০০টি পাল্টা সফল আঘাত হানে। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে গত ৭ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন।
বর্তমান কূটনৈতিক সংকটের জন্য মার্কিন প্রশাসনকে দায়ী করে ইরানের এই শীর্ষ নীতি-নির্ধারক জানান, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির বল এখন আমেরিকার কোর্টে। ট্রাম্প প্রশাসনের অস্পষ্ট এবং দ্বিধাদ্বন্দ্বপূর্ণ বক্তব্য ইরানের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে না। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের গভীর অবিশ্বাস দূর করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনকে তাদের দেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্পষ্ট কূটনৈতিক ভাষায় কথা বলার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠক বা আলোচনার ক্ষেত্রে তেহরান কিছু ন্যূনতম শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে—এমন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রেজায়ি বলেন, ইরান তাদের আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলোতে অবরুদ্ধ থাকা জাতীয় সম্পদ মুক্তির স্পষ্ট দাবি জানিয়েছে। কিন্তু মার্কিনিদের পক্ষ থেকে এখনো অস্পষ্ট ও ধোঁয়াশাপূর্ণ জবাব আসছে। এই অবরুদ্ধ তহবিল ফিরিয়ে দেওয়াই হবে ইরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে মার্কিন আন্তরিকতার প্রথম ও ন্যূনতম পরীক্ষা।
পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে তেহরান তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। খামেনির উপদেষ্টা জানান, ইরান আন্তর্জাতিক নিয়ম এবং পরমাণু অস্ত্র অসংযুক্তি চুক্তি (এনপিটি) মেনেই তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে ২০১৫ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নেওয়ার পর মার্কিন প্রশাসনের ওপর ইরানের কোনো আস্থা নেই। ফলে এই মুহূর্তে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন কোনো চুক্তির বিষয়ে আলোচনা সম্পূর্ণ অর্থহীন।
হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই আন্তর্জাতিক জলপথটি সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে সেখানে যদি কোনো বহিঃশক্তির সামরিক উসকানি বা জোরপূর্বক নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করা হয়, তবে ইরান তার কড়া জবাব দেবে। প্রণালিটির ভৌগোলিক অবস্থান ইরান ও ওমানের সীমান্তাধীন হওয়ায় আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সেখান থেকে পরিবেশ ও ট্রানজিট ফি আদায়ের বৈধ অধিকার তাদের রয়েছে।
সাক্ষাৎকারে কুয়েত বিমানবন্দরে হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে আইআরজিসির সাবেক এই প্রধান কমান্ডার বলেন, ইরান কোনো বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেনি। মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে তারা কেবল কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। প্রতিবেশী কিছু দেশ মার্কিন বাহিনীকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিলেও ইরান কেবল মার্কিন স্বার্থ ও সামরিক স্থাপনাগুলোতেই নিখুঁত পাল্টা আঘাত হেনেছে।
সবশেষে আধুনিক যুদ্ধের কৌশল নিয়ে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মোহসেন রেজায়ি বলেন, চলমান এই সংঘাত প্রমাণ করেছে যে প্রথাগত বা প্রচলিত যুদ্ধের যুগ এখন শেষ। বর্তমান সময়ে সৃজনশীল উপায়ে পরিচালিত অসম যুদ্ধ বা ‘অ্যাসিম্যাট্রিক ওয়ারফেয়ার’ অনেক বেশি কার্যকর ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে। ইরানের সামরিক শক্তি কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ওপর সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তেহরান মূলত মার্কিন স্থল অভিযানের অপেক্ষায় ছিল, যাতে বিশ্ব ইরানের শক্তিশালী স্থলবাহিনীর আসল সক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতে পারে।


