অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটেছে। মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, পরিচালন দক্ষতা ও তারল্য—সব প্রধান সূচকেই ইসলামি ব্যাংকগুলোর পারফরম্যান্স দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ‘ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট-২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এই খাতের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রবৃদ্ধির সূচকও কমেছে, যদিও সামগ্রিক ব্যাংকিং বাজারে তাদের অংশীদারি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় আরও খারাপ হয়েছে। ব্যাংকগুলো ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। মোট সম্পদের বিপরীতে বিনিয়োগ আয় বা মুনাফা কমে যাওয়া এবং আমানতকারীদের পেছনে অধিক মুনাফা ব্যয়ের কারণে ব্যাংকগুলোর সম্পদের ওপর রিটার্ন (আরওএ) নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে গেছে। এর পাশাপাশি মোট বিনিয়োগ, আমানত, সম্পদ ও শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটির প্রবৃদ্ধিও শ্লথ হয়ে পড়েছে। তারল্যসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যেমন—বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) এবং লিকুইডিটি কভারেজ রেশিও (এলসিআর) নির্ধারিত সীমা ধরে রাখতে পারেনি। এমনকি নেট স্ট্যাবল ফান্ডিং রেশিওর (এনএসএফআর) ক্ষেত্রেও ইসলামি ব্যাংকিং খাত নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ ও মূলধনের অনুপাত বা ক্যাপিটাল টু রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) এবং লিভারেজ অনুপাতের ক্ষেত্রে ইসলামি ব্যাংকগুলোতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলো সম্মিলিতভাবে সিআরএআর, ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফার (সিসিবি) এবং লিভারেজ রেশিওর কোনোটিই ন্যূনতম নিয়ন্ত্রক মানদণ্ড অনুযায়ী বজায় রাখতে পারেনি। সিআরএআর ও লিভারেজ রেশিও ২০২৪ সালের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ঋণাত্মক অবস্থায় নেমে গেছে। বছরের শেষভাগে ইসলামি ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত সিআরএআর দাঁড়ায় ঋণাত্মক ১ হাজার ৩৮৯ দশমিক ১০ বিলিয়ন টাকা, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধনের প্রয়োজন ছিল ৩২৬ দশমিক ৮১ বিলিয়ন টাকা। দেশের কার্যরত ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র তিনটি ব্যাংক ন্যূনতম কমন ইকুইটি টিয়ার-১ (সিইটি-১) মূলধন বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং মাত্র দুটি ব্যাংক ক্যাপিটাল কনজারভেশন বাফারের শর্ত পূরণ করতে পেরেছে।
সম্পদের গুণগত মানের ক্ষেত্রে প্রচলিত ধারা বা সনাতনী ব্যাংকগুলোর তুলনায় ইসলামি ব্যাংকগুলোর গ্রস নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্ট (জিএনপিএল) বা খেলাপি বিনিয়োগ এবং নেট নন-পারফর্মিং ইনভেস্টমেন্ট (এনএনপিএল) অনুপাতের অবনতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে জিএনপিএল এবং এনএনপিএল অনুপাত আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যথাক্রমে ৫৬ দশমিক ১৫ শতাংশ ও ২৯ দশমিক ১৮ শতাংশে পৌঁছায়। তবে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একীভূতকরণ বা পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকা পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক বাদ দিলে জিএনপিএল ও এনএনপিএল অনুপাত কিছুটা কমে যথাক্রমে ৩৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং ২৯ দশমিক ৬১ শতাংশে দাঁড়ায়। খেলাপি বিনিয়োগের এই উচ্চ হারের কারণে ব্যাংকগুলোর মুনাফা করার সক্ষমতা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এই খাতের সম্পদে রিটার্ন (আরওএ) ছিল ০ দশমিক ১২ শতাংশ, ২০২৫ সালে তা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়ে ঋণাত্মক ২৩ দশমিক ৯০ শতাংশে নেমে আসে। ১০টি ইসলামি ব্যাংকের মধ্যে ছয়টির আরওএ খাতের গড় হারের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকলেও সামগ্রিকভাবে সিংহভাগ ব্যাংকের আয়ের সূচক ছিল নেতিবাচক।
এমন চরম আর্থিক সংকটের মধ্যেও দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত সংগ্রহ এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নে ইসলামি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা এখনো বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরুর পর থেকে সুদমুক্ত ও অংশীদারিভিত্তিক ব্যাংকিং দর্শনের কারণে এই ব্যবস্থা সাধারণ গ্রাহকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক (যার মধ্যে পাঁচটি বর্তমানে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অধীন) মোট ১ হাজার ৭০০টি শাখার মাধ্যমে তাদের ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর বাইরে ১৭টি প্রচলিত বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৪১টি ইসলামি ব্যাংকিং শাখা এবং ২১টি প্রচলিত ব্যাংকের ৯১৯টি ইসলামি ব্যাংকিং উইন্ডোর মাধ্যমে শরিয়াহভিত্তিক সেবা দেওয়া হচ্ছে। দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে মোট বিনিয়োগের ২৬ দশমিক ০১ শতাংশ, আমানতের ১৯ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং মোট সম্পদের ২০ দশমিক ৮৩ শতাংশই রয়েছে এই ইসলামি ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের আর্থিক খাতের একটি বড় অংশ জুড়ে থাকা এই খাতটির তারল্য ও মূলধন সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ তদারকি ও কার্যকর নীতিসহায়তা জরুরি।


