ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এজেন্ডায় ছিল না, দাবি শাহবাজ শরিফের

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংলাপে ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এজেন্ডায় ছিল না, দাবি শাহবাজ শরিফের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সংলাপে দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কখনোই আলোচনার টেবিলে বা এজেন্ডায় ছিল না বলে স্পষ্ট জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। অথচ এর আগে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করাকেই দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক তৎপরতার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ইসলামাবাদে সফররত ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী এই তথ্য নিশ্চিত করেন।

‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (এমওইউ)-এর প্রসঙ্গ টেনে শাহবাজ শরিফ বলেন, এটি কোনো ধারণা নয় বরং বাস্তব সত্য যে ইরান কখনোই তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে চায়নি এবং তা আলোচনার সূচিতেও অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ সময় বৈশ্বিক রাজনীতির দ্বিমুখী নীতির সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, অন্য দেশগুলোর ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারলে ইরানের কেন থাকবে না—এমন দ্বিচারিতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একই সংবাদ সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আরও কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কখনোই কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির অংশ হবে না এবং এ বিষয়ে তারা কোনো ধরনের আপস করবেন না। দেশের প্রতিরক্ষায় এই ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আজ যদি ইরানের এই আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা না থাকত, তবে আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ও পশ্চিমা শক্তিগুলো গাজা উপত্যকার মতোই ইরানকেও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিত। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও প্যারিসে অনুষ্ঠিত জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধের দাবিটি অবাস্তব ছিল। তিনি মন্তব্য করেন, অন্য দেশগুলোর কাছে যখন এই প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে, তখন ইরানের কাছে তা না থাকাটা এক ধরনের বৈষম্য।

অথচ সংকটের শুরুতে আমেরিকার অবস্থান এমন ছিল না। গত ১ এপ্রিল প্রকাশিত এক মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্মারকে পরিষ্কার বলা হয়েছিল, অভিযানের প্রথম দিন থেকেই তাদের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য ছিল ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করা এবং তাদের নৌবাহিনীর হুমকি নির্মূল করা। তবে সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর আমেরিকার এই প্রাথমিক লক্ষ্যগুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস কিংবা ইউরেনিয়াম মজুত জব্দ করার মতো মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটিও অর্জিত না হওয়ায় বর্তমানে ওয়াশিংটন তাদের কৌশল পুনর্নির্ধারণ করেছে। ফলে বর্তমানে মার্কিন প্রশাসন কেবল স্ট্র্যাটেজিক জলপথ হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা এবং ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেই বিষয়ের ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে।

পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় সুইজারল্যান্ডে ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর আওতায় দুই দেশের মধ্যে এই উচ্চপর্যায়ের কারিগরি আলোচনা চলছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মধ্যে প্রথম দফার বৈঠককে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো ‘ইতিবাচক অগ্রগতি’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা দীর্ঘদিনের অবরোধের মুখে পড়া ইরানের তেল রপ্তানি ও স্থবির অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই আলোচনাকে সফল উল্লেখ করে জানিয়েছেন, আগামী ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর রোডম্যাপ তৈরি হয়েছে।

তবে এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় লেবানন সীমান্তেও শত্রুতা অবসানের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইল আমেরিকার এই যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করায় ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে পঞ্চম দফার পৃথক ও প্রত্যক্ষ আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন দিনব্যাপী এই বৈঠকে লেবানন মূলত দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, বন্দিমুক্তি এবং বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের পুনর্বাসনের সময়সীমা নির্ধারণের দাবি জানাচ্ছে। বিপরীতে ইসরাইল সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টিকে হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রিকরণের শর্তের সাথে জুড়ে দিয়েছে এবং দক্ষিণ লেবাননে নিজস্ব নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখার দাবিতে অনড় রয়েছে। এই আঞ্চলিক ভূরাজনীতি ও স্বার্থের সংঘাতের মধ্যে ইসলামাবাদের এই নতুন তথ্য প্রকাশ মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ