অপরাধ ডেস্ক
রাজধানী ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) চলমান নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে গত ২৪ ঘণ্টায় ৩৬৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযানকালে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করার পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন থানায় গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে মোট ৬০টি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ মেহেদী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য জানিয়েছেন।
ঢাকা একটি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ মেগাসিটি হওয়ায় এখানে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার রোধ করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সবসময়ই একটি অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ডিএমপির আটটি ক্রাইম ডিভিশন (অপরাধ বিভাগ) এবং গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ডিএমপির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানীর প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই পুলিশের এই চিরুনি অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে রমনা বিভাগে ২০ জন, লালবাগ বিভাগে ২১ জন, ওয়ারী বিভাগে ৪৯ জন, মতিঝিল বিভাগে ৬৩ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৫০ জন, মিরপুর বিভাগে ৬৯ জন, গুলশান বিভাগে ৪১ জন এবং উত্তরা বিভাগে ৪২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া অপরাধ দমনে বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে পরিচিত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) পৃথক অভিযান চালিয়ে আরও ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, মিরপুর এবং মতিঝিল বিভাগ থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মিরপুর অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা এবং মতিঝিল দেশের প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ায় এসব স্থানে ভাসমান অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ীদের আনাগোনা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। ফলশ্রুতিতে জননিরাপত্তার স্বার্থে এসব এলাকায় পুলিশের নজরদারি ও তৎপরতাও বৃদ্ধি করা হয়েছে।
গ্রেফতারের পাশাপাশি এই সাঁড়াশি অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মাদকদ্রব্য ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা নগরবাসীর মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি নিয়ে আসবে। উদ্ধারকৃত মাদকের মধ্যে রয়েছে সাড়ে ৮৬ কেজি গাঁজা এবং ৭ হাজার ৯৭৭ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। এছাড়া অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে ছিনতাই বা ডাকাতিতে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রাখা ৫টি চাকু, একটি কাঁচি, দুটি এসএস পাইপ এবং তিনটি লাঠি জব্দ করেছে পুলিশ। অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের এই ঘটনা রাজধানীতে মাদক চোরাচালান ও বিস্তারের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। বিশেষ করে ইয়াবা ও গাঁজার মতো মাদকের সহজলভ্যতা তরুণ ও যুবসমাজের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসব মাদক নিত্যনতুন কৌশলে রাজধানীতে প্রবেশ করে এবং খুচরা বিক্রেতাদের মাধ্যমে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে, যা রোধে পুলিশের এই অভিযান কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
এর পাশাপাশি চাকু, এসএস পাইপ ও লাঠির মতো দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, রাজপথে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, ছিনতাইকারী বা কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা সক্রিয় থাকার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গভীর রাতে বা ভোরে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীদের টার্গেট করে এসব অস্ত্র দিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার ঘটনা রাজধানীতে নতুন নয়। পুলিশের এই ধরনের তাৎক্ষণিক ও নিয়মিত অভিযান এসব অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে মাদক বাণিজ্য, কিশোর গ্যাং এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। নিয়মিত এই ধরনের পুলিশি অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো শহরকে সম্পূর্ণভাবে মাদকমুক্ত করা এবং সাধারণ নাগরিকদের স্বাধীনভাবে চলাচলের জন্য একটি নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শুধুমাত্র গ্রেফতার ও মামলা দায়েরের মধ্যেই পুলিশি কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে দীর্ঘমেয়াদে অপরাধ নির্মূল সম্ভব নয়। এসব মাদকের মূল হোতা, অর্থলগ্নিকারী এবং সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি অপরাধ দমনে সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নিজ নিজ এলাকায় কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হলে দ্রুত নিকটস্থ থানা অথবা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে পুলিশকে অবহিত করার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ প্রদান করা হচ্ছে।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগ থেকে আরও জানানো হয়েছে, গ্রেফতারকৃত ৩৬৩ জনের বিরুদ্ধে নিজ নিজ এলাকার সংশ্লিষ্ট থানায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, অস্ত্র আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করে আদালতে সোপর্দ করা হবে। অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় এবং অধিকতর তদন্তের স্বার্থে অনেক আসামির রিমান্ডও আবেদন করতে পারে পুলিশ। নগরবাসীর জানমালের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে এবং সব ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সমূলে উৎপাটন করতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এই ধরনের সাঁড়াশি অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।


