যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে অ্যান্ডি বার্নহামের আরোহণ প্রায় নিশ্চিত: এমপিদের নজিরবিহীন সমর্থন

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে অ্যান্ডি বার্নহামের আরোহণ প্রায় নিশ্চিত: এমপিদের নজিরবিহীন সমর্থন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির পরবর্তী নেতৃত্ব এবং দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে নাটকীয়ভাবে এগিয়ে গেছেন ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র অ্যান্ডি বার্নহাম। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রথম দফার মনোনয়ন প্রক্রিয়াতেই তিনি দলীয় আইনপ্রণেতাদের (এমপি) নজিরবিহীন সমর্থন লাভ করেছেন। হাউস অব কমন্সের মোট ৪০৩ জন লেবার এমপির মধ্যে ৩২২ জনই ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বার্নহামের পক্ষে তাঁদের সমর্থন ব্যক্ত করেছেন।

দলীয় বিধি অনুযায়ী, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বী অন্য কোনো প্রার্থীর দাঁড়ানোর পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করতে বার্নহামের আর মাত্র একজন এমপির মনোনয়ন প্রয়োজন। বর্তমানে তিনি প্রয়োজনীয় ৩২৩টি মনোনয়নের এই জাদুকরী সংখ্যা থেকে মাত্র একটি ভোট দূরে অবস্থান করছেন। ফলে কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক উলটপালট না হলে কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে তাঁর পা রাখা এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।

লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী তফশিল অনুযায়ী, নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী বৃহস্পতিবার। প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ না থাকায় আগামী শুক্রবার একটি বিশেষ সম্মেলনের মাধ্যমে অ্যান্ডি বার্নহামকে আনুষ্ঠানিকভাবে লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর আগামী ২০ জুলাই (সোমবার) তিনি ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহাম আর মাত্র একটি মনোনয়ন পেয়ে ৩২৩-এর কোটা পূর্ণ করলে অন্য কোনো প্রার্থীর পক্ষে এই প্রতিযোগিতায় নামার আর কোনো গাণিতিক সুযোগ থাকবে না। কারণ লেবার পার্টির নিয়ম অনুযায়ী, শীর্ষ পদের লড়াইয়ে অংশ নিতে হলে যেকোনো প্রার্থীকে অন্তত ৮১ জন এমপির সমর্থন পেতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাকি থাকা সংসদ সদস্যদের সংখ্যা অনুযায়ী আর কারও পক্ষেই সেই কোটা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাছাড়া বৃহস্পতিবার প্রারম্ভিক মনোনয়ন পর্বে যেসব লেবার এমপি অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁরা সোমবার পার্লামেন্টে ফিরে বার্নহামকেই সমর্থন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর আগে সাবেক জুনিয়র প্রতিরক্ষামন্ত্রী আল কার্নস এই প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলে বার্নহামের পথ কার্যত নিষ্কণ্টক হয়ে যায়।

অ্যান্ডি বার্নহামের এই দ্রুত উত্থানের পটভূমি তৈরি হয়েছে মূলত গত মে মাসে অনুষ্ঠিত যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির চরম বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে। দলটির এই ভরাডুবির পর দলের ভেতর থেকেই নেতৃত্ব ও নীতিগত পরিবর্তনের জোরালো দাবি ওঠে। আইনপ্রণেতাদের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে গত মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ঠিক এই সংকটকালেই মেকারফিল্ড উপ-নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়ে দীর্ঘ বিরতির পর পার্লামেন্টে ফিরে আসেন ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় সাবেক মেয়র বার্নহাম। এমপি হিসেবে তাঁর শপথ নেওয়ার দিনই স্টারমার আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের ঘোষণা দেন, যা বার্নহামের জন্য এক অভাবনীয় রাজনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করে।

মনোনয়ন পর্বে বিপুল সমর্থন পাওয়ার পর এক বিবৃতিতে লেবার এমপিদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। তিনি বলেন, দলের সব স্তরের মানুষের কাছ থেকে আসা এই অভূতপূর্ব সমর্থন প্রমাণ করে যে ব্রিটেনের রাজনীতিতে এখন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। তিনি ব্রিটেনের শাসনক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ওয়েস্টমিনস্টার থেকে সরিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতার জন্য বার্নহামকে সংসদ সদস্যদের সমর্থনের পাশাপাশি লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত ৩১টি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত তিনটির মনোনয়ন লাভ করতে হবে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বর্তমান বাস্তবতায় এটি কেবলই একটি নিয়মরক্ষা মাত্র। তবে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দলের অভ্যন্তরে কোনো কোনো মহল থেকে তাঁর ভবিষ্যৎ নীতি ও পরিকল্পনা বিস্তারিত প্রকাশের দাবিও উঠেছে।

বিশেষ করে ২০১৭ সালে পার্লামেন্ট ছাড়ার পর দীর্ঘ সময় জাতীয় রাজনীতির বাইরে থাকায় বর্তমানের অনেক নতুন এমপির সঙ্গে বার্নহামের গভীর রাজনৈতিক সংযোগ নেই। এই নতুন সংসদ সদস্যদের আস্থা অর্জন করা তাঁর জন্য একটি বড় মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী সোমবার তিনি পার্লামেন্টে এমপিদের মুখোমুখি হয়ে নিজের বিস্তারিত রূপরেখা ও কার্যপরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।

নতুন সরকারের নীতিগত অবস্থানের বিষয়ে বার্নহাম ইতিমধ্যেই কিছু ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি ম্যানচেস্টারে একটি নতুন ‘নম্বর ১০’ বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আঞ্চলিক ইউনিট খোলার প্রস্তাব করেছেন, যা আবাসন ও পরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক খাতে স্থানীয় সরকারকে আরও বেশি ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ দেবে। এর পাশাপাশি তিনি পানি ও জ্বালানি খাতকে সরাসরি জনগণের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনার মতো সমাজতান্ত্রিক ঘরানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে গাজা যুদ্ধ নিয়ে লেবার পার্টির প্রাথমিক ও ধীরগতির অবস্থানের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন বার্নহাম, যা দলটির একটি বড় অংশের ক্ষোভ প্রশমন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা খাতে টেকসই বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশ্বাসও দিয়েছেন। সামগ্রিক পরিস্থিতির মূল্যায়নে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও বার্নহামের নেতৃত্বগুণের প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি দেশের জন্য একজন অত্যন্ত দক্ষ ও সফল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করবেন।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ