রাজনীতি ডেস্ক
মাদককে দেশের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক ক্ষতির বিবেচনায় মাদকের প্রভাব এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের তরুণ প্রজন্মকে জনশক্তিতে রূপান্তর না করে মাদকের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ফলে জাতীয় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
শুক্রবার বরিশাল জেলার চরমোনাই ইউনিয়নে আয়োজিত ‘মাদকমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে সুধী সেমিনার ও আলোচনা সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মুফতি রেজাউল করীম বলেন, ‘বাংলাদেশ জনমিতি লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পেয়েছিল। এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে উন্নত রাষ্ট্র গঠন এবং উদ্বৃত্ত জনশক্তি বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার সুযোগ ছিল। কিন্তু পূর্ববর্তী সরকারগুলো সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো মাদককে প্রশ্রয় দিয়ে জাতীয় মেধাকে ধ্বংস করার পথ প্রশস্ত করা হয়েছে, যার ফলে আজ একটি বড় অংশ কর্মক্ষমতা হারিয়েছে।’
মাদক নির্মূলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে ইসলামী আন্দোলনের আমির বলেন, মাদক সমস্যা মোকাবিলায় চাহিদা ও যোগান—উভয় দিক থেকেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদকের চাহিদা কমিয়ে আনার জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মাদকের সরবরাহ লাইন বা সিন্ডিকেট নির্মূল করার পূর্ণ দায়ভার রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বা কঠোর নজরদারির অভাবে মাদক পাচারের রুটগুলো এখনো সচল রয়েছে, যা সামগ্রিক সামাজিক অস্থিতিশীলতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সেমিনারে তিনি চরমোনাই ইউনিয়নসহ পুরো দেশকে মাদকমুক্ত করতে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক সমন্বিত আন্দোলনের আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, কেবল আইন দিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এর জন্য প্রতিটি এলাকায় পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়ে নৈতিক জাগরণ জরুরি।
চরমোনাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ জিয়াউল করীমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম। তিনি মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধে ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দলের সহকারী মহাসচিব মাওলানা সৈয়দ এসহাক মুহাম্মদ আবুল খায়ের মাদক নির্মূলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের পক্ষে মত দেন। এছাড়া প্রশাসনিক পর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) এডিসি (দক্ষিণ) মুহাম্মাদ বেলাল হুসাইন এবং কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আল মামুন উল ইসলাম সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। তারা মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা এবং আইনি সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জসমূহ তুলে ধরেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং এ ক্ষেত্রে জনগণের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে মাদক সমস্যা কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথেও একটি বড় বাধা। মাদকাসক্তির কারণে শ্রমশক্তি হ্রাস পাওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। মুফতি রেজাউল করীমের এই আহ্বান ও মাদক নির্মূলের দাবিটি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র যদি মাদকের সরবরাহ লাইন বন্ধ করতে সফল হয় এবং একই সঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে, তবেই এই জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। সেমিনারে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও সর্বস্তরের জনগণ মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।


