বাংলাদেশের বৈদেশিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হবে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ। ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণের চেয়ে আমদানি-রপ্তানি, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং জনশক্তি রপ্তানির মতো অর্থনৈতিক নিয়ামকগুলোই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে। শনিবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতি (বিসিএফএ) আয়োজিত ‘লং লিভ বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এসব কথা বলেন।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি মূলত অর্থনীতিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে বিবেচনায় রেখেই বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক সম্পর্ক ও কৌশল নির্ধারণ করছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় চীনকে অন্যতম প্রধান কৌশলগত ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের (এফডিআই) ক্ষেত্রে বর্তমানে চীনের অবস্থান দ্বিতীয়। এই বিনিয়োগের ধারা আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে উভয় দেশ কাজ করছে।
বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে এই বিশাল বাণিজ্যের সিংহভাগই আমদানি নির্ভর। বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানির পরিমাণ এখনও এক বিলিয়ন ডলারের নিচে। এই বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে চীন সরকার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী নির্দেশনায় এই রপ্তানি বৃদ্ধিকে বর্তমান সরকার অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে।
আঞ্চলিক সংযোগ ও যোগাযোগের গুরুত্বারোপ করে মন্ত্রী বলেন, অবকাঠামোগত যোগাযোগ ছাড়া কোনো অর্থনীতির টেকসই বিকাশ সম্ভব নয়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশের নেতা তারেক রহমানের নির্দেশনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিনের কিছু জটিলতা কাটিয়ে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। আঞ্চলিক উন্নয়নের স্বার্থে এই উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। একইসঙ্গে ভারতসহ এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকেও এই অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হবে, যা পুরো অঞ্চলের জন্য কৌশলগত বিজয় হিসেবে গণ্য হবে।
পররাষ্ট্রনীতির দর্শন ব্যাখ্যা করে তথ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতিতে বিশ্বাসী। আমাদের বৈদেশিক নীতি কোনো নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বলয়ে আবদ্ধ নয়। আমরা চীন ও ভারত থেকে পণ্য আমদানি করি, ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে পণ্য রপ্তানি করি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া থেকে রেমিট্যান্স আয় করি। এই বহুমুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারিত হচ্ছে। চীন আমাদের এই বাস্তবসম্মত অবস্থানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মন্ত্রী বলেন, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি অন্যতম বড় মানবিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি। চীন সরকার বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়টি অনুধাবন করেছে। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী উত্তরণে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে চীন আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে সরকার প্রত্যাশা করে। তিনি বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার মৈত্রী ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমকে আরও ফলপ্রসূ করতে চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সমিতির সভাপতি ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট নজমুল হক নান্নু।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি ও শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসসহ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।


