জাতীয় ডেস্ক
সারাদেশে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতিদিন মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের সংক্রমণ ও উপসর্গ আশঙ্কাজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে হাম ও হামের প্রাদুর্ভাব সংক্রান্ত উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৮৭৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
আজ রবিবার দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৬৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যাদের মধ্যে হামে নিশ্চিত আক্রান্ত ৭৫ জন এবং হামের উপসর্গযুক্ত রোগীর সংখ্যা ৯৮৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯৩৮ জন শিশু দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছে ৯৪২ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৫ মার্চ থেকে সংগৃহীত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই সময়সীমার মধ্যে সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হওয়া হামে মৃত্যু হয়েছে আরও ৯৮ জন শিশুর। এই পাঁচ মাসে সন্দেহভাজন হাম রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৩২০ জনে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে ১৭ হাজার ১১৫ জনের দেহে নিশ্চিতভাবে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮২ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়েছে, যাদের মধ্যে ইতোমধ্যে ১ লাখ ১৪ হাজার ১৪২ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসবাহিত রোগ যা প্রধানত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে বাতাসের সাহায্যে ছড়ায়। শিশুরাই এই রোগের প্রধান শিকার। সাধারণত আক্রান্ত শিশুর উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরজুড়ে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। যথাযথ সময়ে সুচিকিৎসা এবং সেবা না পেলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ (এнцеফালাইটিস), তীব্র ডায়রিয়া, পুষ্টিহীনতা এবং অন্ধত্বের মতো মারাত্মক জটিলতা তৈরি হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে শিশুর প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যেসব শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে কিংবা পর্যাপ্ত টিকা কর্মসূচির আওতায় আসেনি, তাদের জন্য এই রোগ অত্যন্ত ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই প্রাদুর্ভাবের পেছনে নিয়মিত টিকাাদান কর্মসূচির সাময়িক স্থবিরতা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে টিকাদানের হার কমে যাওয়া একটি বড় কারণ হতে পারে। হাম প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন রয়েছে, যা শিশুর ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজে প্রদান করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং জনস্বাস্থ্য বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে প্রাদুর্ভাবকবলিত এলাকাগুলোতে সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি (এসআইএ) জোরদার করার পরমর্শ দেয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে আক্রান্তদের দ্রুত আইসোলেশন ও প্রয়োজনীয় সরকারি হাসপাতালে সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।
বর্তমান ধারায় সংক্রমণ অব্যাহত থাকলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর যেমন চাপ বাড়বে, তেমনই শিশু মৃত্যুর হার আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত রোগীদের দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা দিতে কাজ করছে।


