বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যবর্তী দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত আন্তঃসীমান্ত নদী সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান ৫৭টি অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার জোরালো আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানী ঢাকার ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এ রূপরেখা তুলে ধরেন। সেমিনারে আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং যৌথ নদী কমিশন বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়।
পানিসম্পদ মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশগত নিরাপত্তার সঙ্গে অভিন্ন নদীগুলোর প্রবাহ সরাসরি সম্পৃক্ত। অভিন্ন নদীগুলোর ওপর দেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য ব্যাপকভাবে নির্ভর করে। ফারাক্কা চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সময়োপযোগী কূটনৈতিক পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে বিগত সময়ে ফারাক্কা ব্যারাজ থেকে কাঙ্ক্ষিত পানির অংশ অর্জন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান সরকার ফারাক্কা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে এবং প্রতিটি অভিন্ন নদীর ক্ষেত্রে ন্যায্য হিস্যা আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশগত বাস্তবতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের দ্রুত প্রভাব, ঘন ঘন বন্যা, খরা, নদীভাঙন এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ফলে নদীর পানির প্রবাহ ও বন্যার পূর্বাভাসসংক্রান্ত সঠিক তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আঞ্চলিক ও আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ দেশের অভ্যন্তরীণ পানি সম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দীর্ঘদিনের সেচ ও পানি সংকট দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে গৃহীত হয়েছে। ইতিপূর্বে অনুমোদন পাওয়া ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের কাজ দ্রুতই শুরু হবে। পাশাপাশি বহুল আলোচিত ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নে টেকনিক্যাল বা কারিগরি পরামর্শক কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ের পর্যালোচনায় রয়েছে। কারিগরি মতামত পাওয়ার পরপরই তিস্তা অববাহিকার স্থায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান কার্যক্রম শুরু করা হবে। খাল পুনঃখনন ও সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া সরকারের ধারাবাহিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (এইবি) সদস্যসচিব প্রকৌশলী শাহরিন ইসলাম তুহিন। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন। মূল প্রবন্ধে দক্ষিণ এশিয়ার নদী অববাহিকাগুলোতে বৈজ্ঞানিক তথ্য ভাগাভাগি এবং আঞ্চলিক পানি কূটনীতির বিভিন্ন সম্ভাবনা ও বৈশ্বিক মডেল উপস্থাপন করা হয়।
সেমিনারে অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজ, নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মো. আশরাফ উদ্দিন বকুল এবং সাবেক সচিব প্রকৌশলী এএনএইচ আক্তার হোসেন। উপস্থিত পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী এবং নীতি-নির্ধারকেরা একমত পোষণ করেন যে, নদীর প্রাকৃতিক রূপ বজায় রেখে সুষম পানি বণ্টন নিশ্চিত করা গেলে কেবল পরিবেশগত সুরক্ষা নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় জ্বালানি, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সংযোগ নতুন মাত্রায় পৌঁছাবে।


