অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ইরান ও ওমানের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনা এবং সংবেদনশীল কৌশলগত জলপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করা নিয়ে অব্যাহত অনিশ্চয়তার জেরে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্যে আবারও ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। এ এশিয়ার বাজারে সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে বিশ্ববাজারের প্রধান দুটি বেঞ্চমার্ক—ব্রেন্ট ক্রুড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই)-এর দর উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
বিশ্ববাজারের হালনাগাদ তথ্যানুযায়ী, আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯১ সেন্ট বা ১ দশমিক ০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৪ দশমিক ৪৬ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল ডব্লিউটিআই-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ৬১ সেন্ট বা ০ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৭৯ ডলারে। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য পথের নিরাপত্তার অভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে।
এর আগে গত সপ্তাহে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা যায়। মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রতিবেশী দেশ ইরান ও ওমানের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার আশঙ্কায় সে সময় উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ৭ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছিল। তবে চলতি সপ্তাহের শুরুতে সেই সমঝোতা বাস্তবায়নের গতি ধীর হয়ে পড়া এবং অচলাবস্থা কাটানো নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় তেলের বাজার আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিশ্বের সার্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। ভৌগোলিকভাবে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই সংকীর্ণ নৌপথটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহের মূল ধমনী হিসেবে বিবেচিত। আঞ্চলিক সামরিক সংঘাত ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার আগে বিশ্বের মোট চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই প্রণালি দিয়েই বিভিন্ন দেশে পরিবাহিত হতো। ফলে এই রুটে যেকোনো ধরনের সাময়িক অবরোধ বা বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা তৈরি হলে পুরো বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ওমানের মধ্যস্থতায় একটি স্থায়ী কূটনৈতিক সমঝোতার খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে তেহরানের দাবি, চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হতে হলে বিশ্বশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কিছু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে। ওয়াশিংটনের নীতি এবং শর্ত পূরণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ বাণিজ্যিকভাবে উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা বা এতে কোনো প্রকার বাধার সৃষ্টি হওয়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি। অনতিবিলম্বে এই অচলবস্থার নিরসন না হলে এশিয়াসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেবে, যা আমদানিভিত্তিক দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের ঋণাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।


