রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বাসভবন পাহারায় থাকা এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলা

রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বাসভবন পাহারায় থাকা এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় কৃষ্ণসাগর উপকূলের গেলেঞ্জিক এলাকায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের একটি সুরক্ষিত ও বিলাসবহুল বাসভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত অতি-সংবেদনশীল এস-৪০০ ‘ট্রায়াম্ফ’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর সফল ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী। ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অব্যাহত দূরপাল্লার ড্রোন অভিযানের অংশ হিসেবে গত ৮ ও ৯ আগস্টের দিকে এই হামলা পরিচালিত হয় বলে সামরিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ইউক্রেনের মানববিহীন ব্যবস্থা বাহিনীর (ইউএসএফ) কমান্ডার মেজর রবার্ট ব্রোভদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, পুতিনের মূল বাসভবন থেকে প্রায় ১২ মাইল দূরে অবস্থিত এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হানে। হামলায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ যন্ত্রটি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেটি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে জ্বলতে থাকে। উপগ্রহ চিত্রেও অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার প্রমাণ মিলেছে। বিমান, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রতিরক্ষায় সক্ষম এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি ধ্বংসের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা বলয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
সামরিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বাসভবন সুরক্ষায় মোতায়েন থাকা এই এস-৪০০ ইউনিটটিকে শুধু প্রতিরক্ষামূলক কাজেই নয়, বরং ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরের ওপর হামলা চালাতেও ব্যবহার করা হচ্ছিল। ৮ আগস্ট ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে ছোড়া অন্তত ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র এই নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় বলে ইউক্রেনের কর্মকর্তা জানান। সম্প্রতি রাশিয়ার ভূখণ্ডে পর্যাপ্ত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষার সীমাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় এই শ্রেণির উচ্চ প্রযুক্তির সামরিক ব্যবস্থার ওপর মস্কোর নির্ভরতা ক্রমশ বেড়েছিল।
যে স্থাপনাটিকে ঘিরে এই হামলা পরিচালিত হয়েছে, সেটি ‘পুতিনের প্রাসাদ’ নামে পরিচিত এবং কৃষ্ণসাগর উপকূলে ২৭ বর্গমাইলের এক বিশাল কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত ‘বাফার জোনে’ অবস্থিত। এ এলাকায় স্থায়ীভাবে বিমান চলাচল নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে এবং এর নিরাপত্তায় ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ও মোবাইল ফায়ার টিম সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকে। ইতালীয় স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত বিলাসবহুল এই কমপ্লেক্সটিতে ক্যাসিনো, আঙুর বাগান, স্পা, থিয়েটার, ইনডোর আইস রিংক এবং ভূগর্ভস্থ নানা ধরনের আধুনিক সুবিধা রয়েছে। তবে ইউক্রেনীয় ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কারণে প্রেসিডেন্ট পুতিন বর্তমানে কৃষ্ণসাগরের এই বাসভবনে অবস্থান না করে মস্কো থেকে দূরে ভালদাই হ্রদ সংলগ্ন কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত পল্লীনিবাসে বেশি সময় কাটাচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন।
কৃষ্ণসাগর সংলগ্ন এলাকায় এই ধরনের হামলার পরিমাণ সম্প্রতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। কিয়েভের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একই অভিযানে অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপে রাশিয়ার আরও দুটি এস-৪০০ উৎক্ষেপণকারী এবং মাঝারি উচ্চতার ‘ওরিয়ন’ ড্রোন নিয়ন্ত্রণকারী একটি প্রধান অ্যান্টেনা ধ্বংস করা হয়েছে। এসকল সুনির্দিষ্ট হামলার ফলে মস্কোর কোটি কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম বিনষ্ট হয়েছে। এছাড়া সোমবার রাতে চার শতাধিক ড্রোন ব্যবহার করে তাতারস্তানের একটি প্রধান তেল শোধনাগারে হামলা চালায় ইউক্রেন, যা চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার অবকাঠামোতে চালানো অন্যতম প্রাণঘাতী ও বৃহৎ ড্রোন হামলা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়ার ভেতরে নিয়মিত সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর আঘাত হেনে যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ব্যয় বৃদ্ধি করাই ইউক্রেনের বর্তমান লক্ষ্য। কিয়েভের ধারণা, রাশিয়ার অভ্যন্তরে সংকট বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ এড়াতে আন্তর্জাতিক নীতি ও আলোচনার ক্ষেত্রে মস্কোর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হবে।
অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতি এবং সামরিক তৎপরতা সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়ে কিয়েভ ও পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ক্রেমলিন। রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মিখাইল গালুজিন সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া এক বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, চলমান সংঘাতের মূল নিরাপত্তা উদ্বেগ ও কারণগুলোর স্থায়ী ও কূটনৈতিক নিরসন না হওয়া পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার যুদ্ধবিরতি বা সামরিক বিরতি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা এবং সীমান্ত অতিক্রম করে দূরপাল্লার বিমান ও ড্রোন হামলার প্রবণতা নিকট ভবিষ্যতে আরও জোরালো হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ