গাজায় তীব্র মানবিক বিপর্যয়: প্রাণহানির সঙ্গে দেখা দিয়েছে দাফনের স্থানের চরম সংকট

গাজায় তীব্র মানবিক বিপর্যয়: প্রাণহানির সঙ্গে দেখা দিয়েছে দাফনের স্থানের চরম সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
গাজা উপত্যকায় চলমান সামরিক সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে নিহতদের দাফন করার স্থানের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অব্যাহত হামলায় কবরস্থানগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় এবং বহু সমাধিস্থল ধ্বংস হওয়ায় স্বজনদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে মারাত্মক প্রতিকূলতার মুখে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নতুন কবরের জায়গা না পেয়ে অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো পারিবারিক কবর পুনরায় ব্যবহার করতে হচ্ছে।
গাজার ধর্মীয় বিষয়ক ও ওয়াক্‌ফ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত উপত্যকার ৪০টিরও বেশি কবরস্থান সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি সংঘাতপূর্ণ ও সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাগুলোতে অবস্থিত কবরস্থানগুলোতে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে সীমিত পরিসরে থাকা অবশিষ্ট কবরস্থানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধের তীব্রতায় উপত্যকাজুড়ে স্বাভাবিক দাফন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। বহু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক দাফনের সুযোগ না থাকায় নিহতদের বাসাবাড়ির আঙিনা, আশ্রয়শিবির, তাঁবুর পাশ এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অস্থায়ীভাবে সমাহিত করতে বাধ্য হয়েছেন স্বজনরা। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধপরিস্থিতি কিছুটা শিথিল হলে ধ্বংসস্তূপ ও অস্থায়ী স্থান থেকে মরদেহ উত্তোলন করে মূল কবরস্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। গাজার প্রশাসনিক সূত্রমতে, হাসপাতাল চত্বরের সাতটি গণকবর থেকেই পাঁচ শতাধিক মরদেহ উদ্ধার করে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দাফনকাজের ক্ষেত্রে জায়গার অভাবের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর তীব্র সংকট ও অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি নতুন সংকট তৈরি করেছে। যুদ্ধপূর্ব সময়ে একটি কবর প্রস্তুতের যে ব্যয় ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্মাণসামগ্রীর তীব্র ঘাটতির কারণে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেলে (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ২২ হাজার থেকে ৩১ হাজার টাকা)। আর্থিক অসচ্ছলতা এবং সামগ্রীর অভাবে অধিকাংশ পরিবার স্থায়ী সমাধিফলক নির্মাণ করতে পারছে না। ফলে ধ্বংসস্তূপের ইট-পাথর, কাদামাটি কিংবা সাধারণ টিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে কবরের সীমানা চিহ্নিত করা হচ্ছে।
গাজার ওয়াক্‌ফ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সেখানকার ৬০টি নিবন্ধিত কবরস্থানের সিংহভাগই ধারণক্ষমতার শেষ প্রান্তে ছিল। দীর্ঘমেয়াদি এই সংকট মোকাবিলায় নতুন জমি অধিগ্রহণ করে কবরস্থান স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে ঘনবসতিপূর্ণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে নতুন উপযুক্ত জায়গা নির্ধারণ এবং বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে সমাহিত মরদেহগুলো নিয়মমাফিক স্থানান্তর করা স্থানীয় প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খান ইউনিসসহ বিভিন্ন এলাকার কবর খননকারীদের ভাষ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর আগে যেসব কবরস্থানে সীমিত সংখ্যক সমাধি ছিল, বর্তমান প্রাণহানির কারণে সেখানে কয়েক হাজার মানুষকে দাফন করতে হয়েছে। প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মরদেহ দাফনের চাপ সামলাতে গিয়ে স্বাভাবিক নিয়মনীতি ও পর্যাপ্ত স্থানের ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অবকাঠামোগত ধ্বংসযজ্ঞ, বিপুল বাস্তুচ্যুতি এবং তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে দাফন ব্যবস্থার এই বিপর্যয় গাজার সামগ্রিক মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, জীবিতদের মৌলিক সুরক্ষার পাশাপাশি নিহতদের যথাযথ মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন করার বিষয়টিও এখন উপত্যকাটির অন্যতম প্রধান মানবিক সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ