আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্বব্যাপী পাসপোর্টের শক্তিমত্তা পরিমাপকারী ‘হেনলি পাসপোর্ট সূচক ২০২৬’-এ ভারতের অবস্থান কিছুটা উন্নত হলেও একই সময়ে ভারতীয় নাগরিকদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণে নতুন সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ সূচকে ভারত ৮৫তম স্থান থেকে পাঁচ ধাপ এগিয়ে ৮০তম অবস্থানে উঠে এসেছে। তবে এই অগ্রগতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার দুটি দেশ—ইরান ও বলিভিয়া—ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসামুক্ত বা সহজ ভিসা সুবিধা প্রত্যাহার করেছে, যা ভারতের বৈশ্বিক ভ্রমণ সক্ষমতার ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত এই সূচক মূলত বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা কতটি দেশে ভিসামুক্ত, ভিসা-অন-অ্যারাইভাল বা ই-ভিসার মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারেন, তার ওপর ভিত্তি করে পাসপোর্টের শক্তিমত্তা নির্ধারণ করে। সূচকে ভারতের অবস্থান উন্নতির অর্থ হলো, সামগ্রিকভাবে কিছু দেশে ভ্রমণ সুবিধা বেড়েছে বা কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তবে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে নীতিগত পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভ্রমণ প্রক্রিয়া জটিল হয়েছে।
ইরানে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা অব্যাহতির সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভিসামুক্ত প্রবেশের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি অসাধু চক্র ভারতীয় নাগরিকদের চাকরি বা তৃতীয় দেশে যাওয়ার মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ইরানে নিয়ে যেত। সেখানে পৌঁছানোর পর তাঁদের একটি অংশকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। এই ধরনের অপরাধমূলক তৎপরতা এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর থেকে সাধারণ ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের জন্য ইরানে ভিসামুক্ত প্রবেশ স্থগিত করা হয়।
বর্তমান নীতিমালায় ইরানে ভ্রমণ বা ট্রানজিটের ক্ষেত্রে ভারতীয় নাগরিকদের আগেই ভিসার জন্য আবেদন করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভিসা ছাড়াই ইরানে প্রবেশ বা ট্রানজিটের প্রলোভন দেখিয়ে যেসব এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারী কাজ করছে, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে নাগরিকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশযাত্রার আগে ভিসা ও ভ্রমণ সংক্রান্ত সব তথ্য যাচাই করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়াতেও ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বলিভিয়ায় যেতে হলে ভারতীয় পাসপোর্টধারীদের ই-ভিসা নিতে হবে। এই ই-ভিসার জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে, প্রয়োজনীয় নথি আপলোড এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে। ভিসাটি ডিজিটালভাবে ইস্যু করা হবে এবং ভ্রমণের সময় সেটির কপি সঙ্গে রাখতে হবে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালে বলিভিয়া ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা-অন-অ্যারাইভাল সুবিধা চালু করেছিল। সে সময় ভারতীয় যাত্রীরা আগাম অনুমতি ছাড়াই বলিভিয়ার বিমানবন্দরে পৌঁছে নির্ধারিত ফরম পূরণ ও ফি পরিশোধের মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারতেন। এই সুবিধাকে কার্যত ভিসামুক্ত ব্যবস্থার কাছাকাছি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে নতুন সিদ্ধান্তের ফলে সেই সুবিধা আর কার্যকর থাকছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, হেনলি পাসপোর্ট সূচকে অবস্থান উন্নত হওয়া একটি ইতিবাচক কূটনৈতিক ইঙ্গিত হলেও এককভাবে এটি কোনো দেশের নাগরিকদের সব ধরনের ভ্রমণ বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না। নিরাপত্তা উদ্বেগ, অভিবাসন নীতি এবং অপরাধ প্রতিরোধসংক্রান্ত কারণেও দেশগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভিসা নীতিতে পরিবর্তন আনে। ভারতের ক্ষেত্রেও সামগ্রিক সূচক উন্নতির পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দেশে ভিসা সুবিধা সীমিত হওয়া সেই জটিল বাস্তবতারই অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বিদেশযাত্রার আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সর্বশেষ ভিসা নীতি যাচাই করা এবং সরকারি সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


