গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী

গণভোটের মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী

রাজনীতি ডেস্ক

বাংলাদেশে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংস অভ্যুত্থানের পথ বন্ধ করার লক্ষ্যেই আসন্ন গণভোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ঐকমত্য গঠন) মনির হায়দার। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক বিষয়ে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণ এবং সাংবিধানিক সংস্কারকে টেকসই ও ন্যায়ভিত্তিক কাঠামোয় প্রতিষ্ঠা করাই এই গণভোটের মূল উদ্দেশ্য।

রোববার সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অডিটরিয়ামে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) যৌথ উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, ডিন, রেজিস্ট্রারসহ শিক্ষক-প্রশাসকরা অংশ নেন। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ও আহত শিক্ষার্থীরাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।

মনির হায়দার বলেন, প্রস্তাবিত গণভোট কোনো তাৎক্ষণিক বা একতরফা সিদ্ধান্ত নয়। এটি দীর্ঘ আলোচনার ফল, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ, মতবিনিময় এবং অভিজ্ঞ মহলের পর্যবেক্ষণ যুক্ত হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই গণভোটের প্রশ্ন ও কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের মৌলিক বিষয়ে জনগণের সম্মতি ছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই এই গণভোটের উদ্যোগ।

তিনি আরও বলেন, গণভোটকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে বিভ্রান্তি রয়েছে, যার একটি কারণ সময়ের সীমাবদ্ধতা। শিক্ষিত সমাজের মধ্যেও গণভোটের উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ পরিসরে গণভোটের বিষয়বস্তু ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক আলোচনা তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

সাংবিধানিক সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে মনির হায়দার বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে একবারই সংবিধান সংস্কার হয়েছে। অন্য অনেক সংশোধনী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রূপান্তরের সময় গণভোট ও সংবিধান সংশোধনের উদাহরণ তুলে ধরা হয়।

প্রস্তাবিত সংস্কারের অংশ হিসেবে সংসদের কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়েও তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, বর্তমান সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে, যার সদস্যরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন। এতে জাতীয় নির্বাচনে কোনো দল সরাসরি আসন না পেলেও নির্দিষ্ট ভোট শতাংশ অর্জন করলে সেই দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক দলের প্রভাব কমে আসবে এবং পারস্পরিক সমঝোতার প্রয়োজন বাড়বে।

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিশেষ কিছু আইন পাসের ক্ষেত্রে শুধু সংসদের দুই কক্ষের অনুমোদনই নয়, গণভোটের মাধ্যমেও জনগণের সম্মতি প্রয়োজন হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি নিয়োগ ও ক্ষমতার বিষয়েও সংস্কারের প্রস্তাব তুলে ধরেন মনির হায়দার। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সব সদস্যের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচন প্রক্রিয়া চালুর প্রস্তাব রয়েছে, যা পূর্বের প্রথা থেকে ভিন্ন।

সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ফলে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় ছাড়া সংসদ সদস্যরা দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এই বিষয়গুলো হলো আস্থা ভোট, জরুরি অবস্থা এবং জাতীয় বাজেট।

নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্মকমিশন গঠনের ক্ষেত্রেও কাঠামোগত সংস্কারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলসহ সংসদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এসব প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে, যাতে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয়।

সভায় বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, জাতীয় জীবনে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ খুব কম আসে এবং এ সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগানো গুরুত্বপূর্ণ। তিনি গণভোট প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন।

সভায় আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন, রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আতিউর রহমান, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী আজাদীসহ অন্যান্য অতিথিরা।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ