সারাদেশ ডেস্ক
রাজশাহী বিভাগের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলায় সাম্প্রতিক সময়ে হামে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চলতি মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্ত ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯ জনকে আইসিইউতে নেওয়ার পরও বাঁচানো যায়নি। শনিবার (২৮ মার্চ) আরও তিন শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
হাম সংক্রমণ সাধারণত ৯ মাসে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। এছাড়া প্রতি তিন বছর অন্তর পাঁচ বছরের শিশুদের জন্য বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে টিকাদান করা হয়। তবে এই সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে অধিকাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস এবং কিছু দুই বছর বয়সী, যা টিকার আদর্শ বয়সের চেয়ে কম।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে কিছু বিলম্বের কারণে সংক্রমণ হার স্বাভাবিকের তুলনায় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী বিভাগে ৭৭ জন হাম আক্রান্তের খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে বড় অংশ ৯ মাসের নিচের শিশু। আক্রান্তদের চিকিৎসার পাশাপাশি বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত এলাকা ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলাগুলোতে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, সংক্রমণ স্থানীয় এবং এটি সীমান্ত দিয়ে আসা বহিরাগত রোগের কারণে নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের হাম পজিটিভ ধরা পড়েছে, যা প্রায় ২৯ শতাংশ সংক্রমণের হার নির্দেশ করে। সংক্রমণ রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলায় সবচেয়ে বেশি। ১ মার্চ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত রাজশাহীতে ৮৪ জন রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে আইসিইউতে নেওয়ার পরও ৯ জন এবং আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গত তিন থেকে চার বছরে অনেক শিশু হাম টিকা মিস করেছে, যার কারণে বর্তমানে সংক্রমণের সংখ্যা বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালের শিশু বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. মাহফুজ রায়হান জানান, অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু টিকা গ্রহণের জন্য উপযুক্ত বয়সের নিচে। যেসব শিশু টিকা পেয়েছে, তাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশকে সফলভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, টিকা মিস হওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। সংক্রমণ থেকে শিশুদের রক্ষা করতে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম জানান, জেলায় সংক্রমণ এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৪৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১০ জন পজিটিভ ধরা পড়েছে, যারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরে গেছে। গোদাগাড়ী উপজেলায় ১৪ শিশু আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৬ থেকে ৯ মাস বয়সীরা বেশি। তারা মূলত টিকা নেওয়ার আগেই সংক্রমিত হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত আইসোলেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ডা. করিম আরও উল্লেখ করেছেন, হামের টিকা ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। প্রতি তিন থেকে চার বছর অন্তর একটি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে আন্ডার ফাইভ শিশুদের টিকা দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরের জন্য নির্ধারিত ক্যাম্পেইনটি বিলম্বিত হয়েছে এবং আশা করা হচ্ছে এটি ২০২৬ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত হবে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, গত বছরের তুলনায় হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে আক্রান্ত শিশুদের নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। দুই বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেশি এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ও বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।


