অপরাধ ও আইন ডেস্ক
রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধা মা নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তার ছেলে এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব এ কে এম আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বুধবার সকালে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা নৈতিক অবক্ষয় ও আইনি লঙ্ঘনের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে প্রশাসন তৎপরতা শুরু করেছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী ঘটনার সত্যতা ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানান, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রচলিত আইন এবং সরকারি কর্মচারী বিধিমালা অনুযায়ী এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে তার সাথে সরাসরি কথা বলে ঘটনার সার্বিক পরিস্থিতি এবং এর পেছনে তার পারিবারিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন বর্তমানে সেই প্রক্রিয়াই অনুসরণ করছে।
এই ঘটনায় দেশের বিদ্যমান ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ এর কার্যকারিতা এবং প্রয়োগের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট করেছেন যে, আইন অনুযায়ী যদি কোনো সন্তান পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা বা ভরণ-পোষণে ব্যর্থতার জন্য দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পাশাপাশি, সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তার পেশাগত ও সামাজিক নৈতিক দায়বদ্ধতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে।
অভিযুক্ত কর্মকর্তা এ কে এম আনিসুর রহমান বর্তমানে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) হিসেবে প্রাক্কলিত দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে একাধিকবার বিভিন্ন মাধ্যমে তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায়নি, যা প্রশাসনের তদন্ত প্রক্রিয়াকে কিছুটা জটিল করে তুলেছে।
এর আগে, গত রবিবার মিরপুরের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাট থেকে বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের পচা-গলা এবং পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় থানা পুলিশ। ফ্ল্যাট থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল করে বিষয়টি অবগত করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ বা পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, মরদেহটি উদ্ধারের বেশ কয়েকদিন আগেই ওই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে তা ওই অবস্থায় পড়ে ছিল।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং সুশীল সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। একজন উচ্চপদস্থ আমলার মায়ের এমন অবমাননাকর ও নিঃসঙ্গ মৃত্যু দেশের পারিবারিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক স্খলনের এক চরম দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষী প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে সমাজে প্রবীণদের নিরাপত্তা ও অধিকার আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তদন্তের অগ্রগতি অনুযায়ী অতি দ্রুত পরবর্তী প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ দৃশ্যমান হবে।


