ভারত-রাশিয়া সম্পর্কে পুনরুজ্জীবন, ইরান যুদ্ধ জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলছে

ভারত-রাশিয়া সম্পর্কে পুনরুজ্জীবন, ইরান যুদ্ধ জ্বালানি নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলছে

 

অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক

ভারত তার প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি কৌশল পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছে, যা চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে তৈরি জ্বালানি ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। নরেন্দ্র মোদি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ২৭ মার্চ রাশিয়ার কাছ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে যুদ্ধবিমান, এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সশস্ত্র ড্রোন, ট্যাংকবিধ্বংসী গোলাবারুদসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষ এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণকে কেন্দ্র করে ভারত সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে গত মাসে ফ্রান্স থেকে রাফাল যুদ্ধবিমানসহ ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমরাস্ত্র ও সরঞ্জাম ক্রয় করেছে। এই প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের নতুন সংযোগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনবিরোধী কৌশলগত জোট কোয়াডে ভারত সদস্য থাকলেও ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

রাশিয়ার সঙ্গে ভারত সম্পর্কের ইতিহাস শীতল যুদ্ধের যুগে শুরু হয়। সেসময় মস্কো ছিল ভারতের প্রধান প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশীদার। বিশ্বব্যাপী নয়াদিল্লির বহুমুখী কূটনৈতিক পদক্ষেপের পরও রাশিয়ার সমরাস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম এবং জ্বালানি সরবরাহে ভারতের নির্ভরতা কমেনি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে রাশিয়া বিপুল ছাড়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি শুরু করে, যা ভারতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সুযোগ তৈরি করে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার তেল ভারতের জ্বালানি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হয়।

ইরান যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আক্রমণ এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌপথ বন্ধের ফলে ভারতের জ্বালানি সরবরাহে বড় প্রভাব পড়ে। দেশটির তেল ও এলএনজি আমদানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে আসার কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পায়। এতে ভারতের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধির ধীরগতি সম্পর্কে সতর্কতা জারি হয়।

এসব প্রেক্ষাপটে ভারতের রাশিয়ার সঙ্গে পুনরায় সম্পৃক্ত হওয়ার পদক্ষেপে সরাসরি তেল ও এলএনজি আমদানির বৃদ্ধি এবং পারস্য উপসাগর এড়িয়ে অন্য নৌপথে সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত। এটি ভারতের জন্য কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে জ্বালানি দামের ওঠানামি মোকাবিলার উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হলেও ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সংযোগ বজায় রাখার মাধ্যমে দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করছে। এটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদী নীতি অনুযায়ী স্বার্থভিত্তিক বৈচিত্র্যময় কূটনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দিককে প্রতিফলিত করে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই কৌশলগত পরিবর্তন বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং দেশের স্বার্থ অনুযায়ী জোট পরিবর্তনের প্রবণতাকে তুলে ধরে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হওয়া শুধু সামরিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং কৌশলগত নমনীয়তার ওপরও প্রভাব ফেলছে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ