নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) সহ অন্যান্য সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রচলিত মুখস্থনির্ভর সিলেবাসের পরিবর্তে প্রার্থীদের প্রকৃত মেধা, সক্ষমতা ও পরিস্থিতি মোকাবিলার দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য ‘স্কিল-বেজড’ বা দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী সরকারের এই পরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
সংসদ অধিবেশনে রাজবাড়ী-২ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. হারুন-অর-রশীদের টেবিলে উত্থাপিত একটি প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী এই তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি সংসদকে জানান, সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যুগোপযোগী সংস্কার আনা এবং একুশ শতকের উপযোগী জনপ্রশাসন গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে পিএসসির অধীনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সিলেবাস ও নিয়োগ প্রক্রিয়া গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে বিদ্যমান সিলেবাসে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজন আনার কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষাবিদ ও মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বিসিএস পরীক্ষার মুখস্থনির্ভর পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করে আসছিলেন। তাদের মতে, বিদ্যমান পদ্ধতির কারণে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে বিশ্লেষণমূলক ক্ষমতা বা বাস্তব সমস্যা সমাধানের দক্ষতার চেয়ে কেবল তথ্য মুখস্থ করার প্রবণতা বেশি তৈরি হচ্ছে। এর ফলে তরুণদের একটি বড় অংশ সৃজনশীলতা বাদ দিয়ে দীর্ঘসময় শুধু তথ্য মুখস্থ করার পেছনে ব্যয় করেন। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে এই বিষয়টির প্রতিফলন ঘটেছে। নতুন দক্ষতাভিত্তিক পদ্ধতিতে একজন প্রার্থীর কেবল বইয়ের জ্ঞান নয়, বরং তথ্যপ্রযুক্তিগত দক্ষতা, উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা যাচাই করা হবে।
সিলেবাস পরিবর্তনের পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভা বোর্ডেও আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি যুক্ত করার কথা জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকারি কর্ম কমিশন শিগগিরই যোগ্যতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার বা ‘কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউ’ (সিবিআই) পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে। এই নতুন পদ্ধতির মূল ভিত্তি হবে প্রার্থীর ‘কেএসএ’ অর্থাৎ নলেজ (জ্ঞান), স্কিলস (দক্ষতা) এবং অ্যাটিটিউড (মনোভাব) মূল্যায়ন। প্রথাগত সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার বদলে প্রার্থীদের বিভিন্ন পরিস্থিতিভিত্তিক (সিচুয়েশনাল) প্রশ্ন করা হতে পারে। এর মাধ্যমে তাদের মানসিক দৃঢ়তা, নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি, নৈতিকতা এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিখুঁতভাবে যাচাই করা সম্ভব হবে, যা একজন দক্ষ প্রশাসকের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি বড় হতাশার কারণ। একটি বিসিএস পরীক্ষা শুরু থেকে শেষ হতে সাধারণত দুই থেকে তিন বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যায়। এর ফলে তরুণরা চরম মানসিক চাপে ভোগেন এবং তাদের জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় হয়। এই সংকট নিরসনে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে মো. আব্দুল বারী বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে এনে মাত্র এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএসের সম্পূর্ণ কার্যক্রম শেষ করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
এর একটি সফল উদাহরণ হিসেবে তিনি ৫০তম বিসিএসের কথা উল্লেখ করেন। এই বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময়ই প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইতোমধ্যে ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়েছে এবং লিখিত পরীক্ষাও শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারের এই উদ্যোগ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের সরকারি চাকরির নিয়োগ ব্যবস্থায় একটি গুণগত পরিবর্তন আসবে। একদিকে যেমন চাকরিপ্রার্থীদের জীবনের মূল্যবান সময়ের সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীলতা কমে গিয়ে তরুণদের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের আগ্রহ বাড়বে। বিশেষ করে, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে দক্ষ, উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিবান্ধব জনপ্রশাসনের রূপরেখা সরকার প্রণয়ন করেছে, এই নিয়োগ সংস্কার তারই একটি অপরিহার্য ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এই সংস্কার কার্যক্রম যেন স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারাবাহিক তদারকি প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


