আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৫৪৯ জনে দাঁড়িয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই ভয়াবহ সংঘাত ও হামলায় হতাহতের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। আজ শনিবার (১৮ এপ্রিল) প্রকাশিত এক নিয়মিত প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় এই ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত মোট ৭২ হাজার ৫৪৯ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ১ লাখ ৭২ হাজার ২৭৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে নতুন করে হামলা ও উদ্ধার অভিযানের পর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আরও আটটি মরদেহ হাসপাতালে গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সাতজন সরাসরি সাম্প্রতিক হামলায় নিহত হয়েছেন এবং একজনকে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে আরও ২৪ জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সূত্রগুলো।
গাজার স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ‘মার্টার্স অ্যাপ্রুভাল কমিটি’ কর্তৃক ব্যাপক যাচাই-বাছাইয়ের পর সম্প্রতি নিহতের তালিকায় আরও ১৯৬ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা বর্তমান পরিসংখ্যানের চেয়ে আরও অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ গাজার একটি বড় অংশ বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং সড়ক ও আবাসিক এলাকাগুলোর নিচে এখনও অসংখ্য মানুষ নিখোঁজ বা আটকা পড়ে আছেন বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা।
গাজার সিভিল ডিফেন্স ও উদ্ধারকারী দলগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত বোমাবর্ষণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অনেক এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স বা উদ্ধার সরঞ্জাম নিয়ে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে উত্তর গাজার অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়, যেখানে খাদ্য ও চিকিৎসার অভাবের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন হামলার কারণে উদ্ধারকাজ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের জীবিত উদ্ধারের আশা যেমন ক্ষীণ হচ্ছে, তেমনি মৃতদেহগুলো সরিয়ে আনাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে আহতদের একটি বড় অংশ মৃত্যুর ঝুঁকিতে রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যা সংকট এবং জ্বালানি স্বল্পতায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গাজা উপত্যকাজুড়ে মানবিক বিপর্যয় এখন চরমে পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণ নাগরিকরা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদী এই যুদ্ধ কেবল গাজার জনপদকেই ধ্বংস করছে না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হলেও মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা এতটাই তীব্র যে, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে এই জনপদ পুনর্গঠন এবং বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ মানুষের পুনর্বাসন একটি দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।


