জাতীয় ও আঞ্চলিক ডেস্ক
গত দুই দিনে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাকলিয়া, আগ্রাবাদ, বায়েজিদ ও খুলশী এলাকায় অন্তত তিনটি শিশু জঘন্য অপরাধের শিকার হয়েছে। ভুক্তভোগী শিশুরা বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। শনিবার সকালে চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের দেখতে যান সিটি মেয়র। সেখানে তিনি শিশুদের সার্বিক চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানান। মেয়রের নির্দেশনা অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগী শিশুদের সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় বহন করছে। চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন জানিয়েছেন, শিশু তিনটি বর্তমানে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া করছে। তবে বয়স অত্যন্ত কম হওয়ায় তারা ঘটনার ভয়াবহতা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারছে না। শিশুরা এবং তাদের স্বজনরা যেন এই গভীর মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেন, সেজন্য চিকিৎসকেরা নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। চিকিৎসাধীন শিশুদের বয়স ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে। অপরাধীরা চকোলেট বা বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ফুসলিয়ে নিয়ে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এ পর্যন্ত ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
এই বর্বর অপরাধের ঘটনা উল্লেখ করে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন একে সমাজের তীব্র নৈতিক অবক্ষয়ের একটি চরম বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, মাত্র ২০-৩০ টাকার কেনাকাটার জন্য এত ছোট শিশুদের একা একা বাইরে বা দোকানে পাঠানো উচিত নয়। কারণ, সমাজে ওত পেতে থাকা অপরাধীরা এই অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে জঘন্য অপরাধ ঘটাচ্ছে। এই সামাজিক ব্যাধি রুখতে তিনি অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষকদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মুখোমুখি করতে বিদ্যমান আইন সংশোধনের দাবি জানান মেয়র। তিনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই ধরনের অপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে প্রকাশ্যে ফাঁসি কার্যকরের আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করেন, যা ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ প্রবণতা হ্রাসে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে।
হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে, গত ৮ বছরে চট্টগ্রামে ১২ বছরের কম বয়সী ৪২২টি শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তবে লোকলজ্জা এবং সামাজিক মর্যাদার ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনা প্রকাশ বা মামলা না করায় প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি এবং উদ্বেগজনক হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার সার্বিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং একটি নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে পুনরুল্লেখ করে।
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) নারী পোশাক শ্রমিকদের অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে মেয়র বলেন, মায়েরা যখন দিন-রাত কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছেন, তখন তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। পোশাক শিল্পের মালিকদের বিশাল বিনিয়োগের তুলনায় একটি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা অত্যন্ত সামান্য বিষয়। তাই বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচিত পোশাক কারখানাগুলোর বার্ষিক নবায়ন ও বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে ডে-কেয়ার সেন্টার থাকার বিষয়টিকে একটি বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে জুড়ে দেওয়া। পূর্বেও অসচেতনতা ও সুরক্ষার অভাবে হালিশহরে এক গার্মেন্টস কর্মীর সাড়ে তিন বছরের শিশু ড্রেনে পড়ে মারা যাওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। এই ধরনের দুর্ঘটনা ও অপরাধের দায় সমাজ বা রাষ্ট্র এড়াতে পারে না।
এমতাবস্থায়, চট্টগ্রামের ১৫টি থানার সুবিধাবঞ্চিত ও কর্মজীবী মায়েদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে একটি বৃহৎ কেন্দ্রীয় ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করার জোরালো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। নগরের ধনাঢ্য ব্যক্তি ও সমাজসেবীদের আর্থিক ও সামাজিক সহায়তায় চসিক এই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগটি দ্রুত বাস্তবায়ন করবে বলে জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক ডে-কেয়ার ব্যবস্থার সম্প্রসারণ কর্মজীবী নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিশুদের ওপর সংঘটিত অপরাধের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে।


