আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের পদত্যাগ সংক্রান্ত গুঞ্জনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে উড়িয়ে দিয়েছে দেশটির সরকার। সম্প্রতি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলে তেহরানের পক্ষ থেকে এই আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক উপপ্রধান মেহদি তাবাতাবায়ি এক বিবৃতিতে এই গুঞ্জনকে ‘মিথ্যা’ ও ‘মিডিয়া গেম’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, কতিপয় বিদেশি গণমাধ্যম সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার করছে, যা চলমান একটি মনস্তাত্ত্বিক লড়াই বা মিডিয়া গেমের অংশ মাত্র।
তাবাতাবায়ি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের জনগণের সেবা করার যে অঙ্গীকার নিয়েছেন, তা থেকে কোনো অবস্থাতেই সরে দাঁড়াবেন না। একই সঙ্গে তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের যাবতীয় জল্পনাকল্পনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ইরান বর্তমানে ঐক্য ও সংহতির যে পথে রয়েছে, তা থেকে পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই। যারা ইরানের জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের সেই উদ্দেশ্য কখনোই সফল হবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তেহরানের সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করার পর থেকেই দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর আন্তর্জাতিক মহলের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে।
এর আগে, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়।
পরবর্তীতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ৮ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। তবে এই যুদ্ধবিরতি অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি বজায় রাখতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় ছিল। সংকট নিরসনে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই পক্ষের প্রতিনিধি দল দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আলোচনায় বসলেও শেষ পর্যন্ত তা কোনো চূড়ান্ত রূপ নিতে ব্যর্থ হয়।
ইসলামাবাদ বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আলোচনার পথ উন্মুক্ত রেখেছে। আঞ্চলিক যুদ্ধ পরিস্থিতির স্থায়ী অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে উভয় পক্ষই পর্দার আড়ালে বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রস্তাব ও পাল্টা প্রস্তাব বিনিময় অব্যাহত রেখেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যখন এই জটিল আলোচনা প্রক্রিয়া চলমান, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের মতো সংবেদনশীল গুঞ্জন ছড়ানোর ঘটনাটি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির প্রয়াস হতে পারে। তবে সরকারের দ্রুত এবং কঠোর অবস্থানের কারণে এই গুঞ্জন দেশের অভ্যন্তরে বড় ধরনের কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারেনি বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক এই টানাপোড়েনের মধ্যে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের নেতৃত্ব এবং তেহরানের পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।


