অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
লেবাননে সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযান আরও জোরদার করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি সেনাসদস্যদের লেবাননের ভূখণ্ডের আরও ভেতরে অগ্রসর হওয়ার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দেওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা রূপ নিয়েছে। এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক লাফেই ২ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল বা ‘ডব্লিউটিআই’ ফিউচারের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৩৭ ডলার বা ২ দশমিক ৭১ শতাংশ বেড়ে ৮৯ দশমিক ৭৩ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৯৩ দশমিক ২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে তৈরি হওয়া তাৎক্ষণিক উদ্বেগের কারণেই বাজারে এমন ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন শান্তি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলেও তা স্থায়ী কোনো সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ইসরায়েল-লেবানন সংঘাত মূলত আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর দীর্ঘদিনের ছায়াযুদ্ধের একটি বড় ধরনের বিস্তার। চলতি বছরের ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইরানের সরাসরি সমর্থনে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করলে এই সংঘাতের সূচনা হয়। পরবর্তীতে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে উভয় পক্ষ একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও সীমান্তে নিয়মিত বিরতিতে গোলাগুলি ও পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ এই অভিযান জোরদার করার ঘোষণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমান সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ ‘হরমুজ প্রণালি’। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশ বাণিজ্যই মূলত এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে সম্পন্ন হয়ে থাকে। গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের জেরে ইরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথটি অবরুদ্ধ করে রাখে। বর্তমানে এই প্রণালিতে পেতে রাখা সামুদ্রিক মাইন নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। জাহাজ চলাচল নির্বিঘ্ন করতে এই সংবেদনশীল প্রণালিটি পুরোপুরি নিরাপদ করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ বিষয়। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে নতুন কোনো চুক্তি সম্পন্ন হলেও বাজারে হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং শীর্ষ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীনের কারখানা খাতের সামগ্রিক কার্যক্রমে বর্তমানে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রপ্তানি হ্রাস ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চীনের অর্থনৈতিক গতি সাময়িকভাবে শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ সংকটের তীব্রতা সেই অর্থনৈতিক মন্দার ভয়কে ছাপিয়ে গেছে। ফলে চাহিদা হ্রাসের আশঙ্কার চেয়ে জোগান বন্ধ হওয়ার ভীতিই বাজারে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে, যা তেলের দামকে ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে তা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


