আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পারস্য উপসাগরের কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও আঞ্চলিক আধিপত্যকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাত এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। মার্কিন বাহিনী কর্তৃক ইরানের কৌশলগত উপকূলীয় রাডার স্থাপনায় বিমান হামলার পরপরই এর পাল্টা জবাব দিয়েছে তেহরান। ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পার্শ্ববর্তী দেশ কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। এই পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী অভিমুখে ধেয়ে আসা ইরানের চারটি ‘ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’ ভূপাতিত করার পর তারা এই প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ড্রোনগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও মিত্রবাহিনীর নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেছিল বলে ওয়াশিংটন দাবি করেছে। এর জবাবে মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর সিরিক (গোরুক) এবং কৌশলগত কেশম দ্বীপে অবস্থিত সামরিক নজরদারি ও রাডার লক্ষ্যবস্তুগুলোতে সুনির্দিষ্ট বিমান হামলা চালায়। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এই অভিযান কোনো বৃহৎ যুদ্ধ শুরুর উদ্দেশ্যে নয়, বরং উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় একটি সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
মার্কিন এই বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় তেহরানের সামরিক নেতৃত্ব। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা প্রকাশিত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তাদের সার্বভৌমত্বে আঘাতের অবিলম্ব জবাব হিসেবে অঞ্চলের ‘শত্রুপক্ষের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে’ শক্তিশালী অ্যারোস্পেস ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। আঞ্চলিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, এই হামলার পর কুয়েত এবং বাহরাইনজুড়ে বিমান হামলার সতর্কবার্তা (এয়ার রেইড সাইরেন) বাজানো হয়।
সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরান কুয়েত ও বাহরাইনের দিকে মোট সাতটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে, যার মধ্যে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্রই মার্কিন ও আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে এবং সপ্তমটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিকটবর্তী মার্কিন লজিস্টিক হাব এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (ফিফথ ফ্লিট) সদর দফতরকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটন দাবি করেছে, এই হামলায় মার্কিন বাহিনীর কোনো সদস্য হতাহত হননি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও নগণ্য।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী। বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহকৃত মোট অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) এক-পঞ্চমাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাত বা অচলাবস্থা সরাসরি বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উভয় পক্ষের মধ্যে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা ইস্যুতে একাধিক পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যাহত হচ্ছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তি ইরানের মধ্যকার এই ‘চোখ রাঙানি ও পাল্টা আঘাতের’ নীতি যদি অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন ও মিত্রবাহিনীর সব ঘাঁটিতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয় পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন এবং অনতিবিলম্বে কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।


